সাইফুল ইসলাম কবির
, বাগেরহাট
চর কেটে ভেকুর দাঁতে নদীর বুক ক্ষতবিক্ষত। তৈরি হয়েছে গভীর গর্ত। সেই গর্তে জোয়ারের পানি ঢুকে ছুটছে তীরের দিকে। পানগুচি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা, সামনে ভাঙনের শঙ্কা। মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়, আর আতঙ্কে দিন কাটছে নদীতীরের তিন শতাধিক পরিবারের। ঝুঁকিতে কাঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৯ পরিবার, প্রায় এক হাজার বিঘা ফসলি জমি ও স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি মহাশ্মশান।
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে পানগুচি নদীর তীরবর্তী এলাকায় নদীর ভরাট হওয়া চর থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এভাবে চর কেটে মাটি নেওয়ার কারণে নদীতীরের প্রাকৃতিক সুরক্ষা নষ্ট হচ্ছে। ভেকু মেশিনের আঘাতে তৈরি গর্ত ও খাল দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবল বেগে ঢুকে পড়ছে। এতে কাঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের সীমানায় ভাঙন শুরু হয়েছে বলে দাবি তাদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মোরেলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের কাঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের কাছাকাছি নদীর চর থেকে ভেকু দিয়ে মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে স্থানীয় এমবিআই ব্রিকস ইটভাটায়। তাদের ভাষ্য, চর কাটার ফলে তৈরি হওয়া বড় বড় গর্ত ও খাল এখন জোয়ারের পানি ঢোকার পথ হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা।
‘আগেও ক্ষতির মুখে পড়েছি’
কাঁঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরে ১৯টি পরিবার বসবাস করছে। বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা নূর জাহান বিবি, গোলবানু বেগম, মাইনূর বেগম ও দলিল শেখ বলেন, এর আগেও নদীর চর থেকে মাটি কেটে নেওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন তারা। সম্প্রতি আবারও ভেকু দিয়ে চর কেটে খাল তৈরি করায় জোয়ারের পানির চাপ বেড়েছে। এতে ঘরবাড়ি নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, নদীর চর কেটে নেওয়ায় শুধু আশ্রয়ণ প্রকল্প নয়, আশপাশের তিন শতাধিক পরিবারই এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। নদীভাঙন শুরু হলে বিপন্ন হতে পারে প্রায় এক হাজার বিঘা ফসলি জমি। একই সঙ্গে হুমকিতে রয়েছে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মহাশ্মশান।
স্থানীয়রা বলেন, নদীর চর কেটে মাটি নেওয়ার কারণে শুধু কাঁঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্প নয়, আশপাশের প্রায় তিন শতাধিক পরিবারও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। প্রায় এক হাজার বিঘা ফসলি জমি এবং স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মহাশ্মশানও নদীভাঙনের হুমকিতে পড়েছে।
তার দাবি, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বর্ষা ও জোয়ারের পানির চাপে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
নদীভাঙনের পাশাপাশি পরিবেশের শঙ্কা
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু নদীভাঙনের ঝুঁকি নয়, পাশের ইটভাটার ধোঁয়ায় পরিবেশও দূষিত হচ্ছে। তাদের দাবি, ইটভাটার ধোঁয়ার কারণে ফলন্ত গাছের ফল ঝরে পড়ছে এবং শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এসব বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দিয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীর চর ছিল নদীতীরের মানুষের প্রাকৃতিক সুরক্ষা। সেই চর কেটে নেওয়ায় নদীর তীরের স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এখন ভেকুর তৈরি গর্ত দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ায় তাদের ভয়—এই গর্তই না আবার ভাঙনের নতুন পথ হয়ে ওঠে।
অভিযোগের পর মাটি কাটা বন্ধ
অভিযোগের বিষয়ে এমবিআই ব্রিকস ইটভাটার স্বত্বাধিকারী শাহজাহান শেখ বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশ পাওয়ার পর ভাটার শ্রমিকদের দিয়ে মাটি কাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের কোনো ক্ষতি হলে তিনি নিজেই তা দেখবেন বলেও জানান তিনি।
মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাবিবুল্লাহ বলেন, কাঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের কাছের ইটভাটায় নদীর চর থেকে মাটি কাটার অভিযোগ পাওয়ার পরই তা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু মাটি কাটা বন্ধের নির্দেশ যথেষ্ট নয়। নদীর তীরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা দ্রুত পরিদর্শন করে ভেকু মেশিন অপসারণ, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং নদীতীর রক্ষায় স্থায়ী উদ্যোগ নিতে হবে।
কারণ, চর কাটা বন্ধ হলেও ভেকুর তৈরি গর্তগুলো রয়ে গেছে। আর সেই গর্তে জোয়ারের পানি ঢুকতে থাকলে ভাঙনের শঙ্কাও থেকেই যায়। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পানগুচির স্রোত একদিন কেড়ে নিতে পারে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা।