বিশেষ প্রতিনিধি
, যশোর
উজান থেকে আসা অভিন্ন ৫৪টি নদীতে শত শত বাঁধ, ড্যাম দিয়ে আর সংযোগ খাল কেটে একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে ভাটির দেশ বাংলাদেশ মরুময়তার দিকে এগোচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ভারতের এই আগ্রাসী তৎপরতার ফলে সবচেয়ে ক্ষতির শিকার হয়েছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল।
এই অঞ্চলের নদীগুলো একে একে শুকিয়ে গিয়ে সরু খালে পরিণত হয়েছে। ব্যাহত হয়েছে প্রাণ-প্রকৃতির স্বাভাবিক বিকাশ। এমনকি এই অঞ্চলের ভূমি গঠন প্রক্রিয়ার ওপরও ফারাক্কাসহ অন্যান্য বাঁধের বিরূপ প্রভাব রয়েছে। পদ্মাসহ অন্যান্য নদীগুলো স্বাভাবিকভাবে পলি বহন করতে পারলে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে ভূমি গঠন প্রক্রিয়াও ত্বরান্বিত হতো। এই অঞ্চলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার জন্যও ফারাক্কা বাঁধ অনেকাংশে দায়ী।
গাঙ্গেয় অববাহিকার গুরুত্বপূর্ণ জনপদ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। এই অঞ্চলের জনজীবন ও প্রাণ-প্রকৃতি গঙ্গা-পদ্মা এবং এর শাখা-প্রশাখার পানির ওপর নির্ভরশীল। সুপ্রাচীন কাল থেকে এই অঞ্চলের মানুষের মূল জীবিকা কৃষি। কিন্তু গঙ্গার ওপর নির্মিত ফারাক্কা বাঁধ ১৯৭৫ সালে চালু করার পর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ক্রমে পানিশূন্য হতে থাকে। এরপর থেকে দেখা দিতে থাকে নানা ধরনের বিপর্যয়কর প্রতিক্রিয়া।
নদ-নদী পানিশূন্য
পদ্মায় পানি না থাকায় এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীর ওপর। এই অঞ্চলের নদীগুলোর পানির প্রধান উৎস পদ্মা। বিশাল এই নদীর প্রধান দুই শাখা গড়াই/মধুমতি ও মাথাভাঙ্গা শুষ্ক মৌসুমে কার্যত পানিশূন্য হয়ে যায়। এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শতাধিক নদ-নদীর মরণদশা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘতম নদী ভৈরব ও কপোতাক্ষ, কুমার, চিত্রা, বেত্রাবতী (বেতনা), হরিহর, ভদ্রা, ফটকি, নবগঙ্গা, মুক্তেশ্বরী, কোদলা, টেকা, বেগবতী প্রভৃতি। এই নদীগুলোর বেশিরভাগ শুষ্ক মৌসুমে পুরোপুরি শুকিয়ে যায়। আবার পানি প্রবাহের প্রাকৃতিক নিয়মের ব্যত্যয় ঘটায় জমে যাওয়া পলিতে বর্ষায় দু’কূল উপচে ফসলি জমি ভাসিয়ে দেয়। ছোট স্রোতধারার মধ্যে বেতনা, আফ্রা, মুক্তেশ্বরী, হরিহর, হাপরখালী, কোদলা, শ্রী, হরি, টেকা, হাকর, আতাই, কোদালিয়া, আমড়াখালি, দায়তলা প্রভৃতি নদী হয় অস্তিত্ব হারিয়েছে, অথবা বিলুপ্তির পথে আছে। পানিশূন্য এসব নদীর বুকে বোরো মৌসুমে ধান চাষ করে কৃষকরা।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের মতে, দক্ষিণ-পশ্চিমের নদ-নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়ার প্রধান কারণ ফারাক্কা বাঁধ। ফারাক্কা পয়েন্টে ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নেওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিম জনপদের প্রাণ-প্রকৃতি, নদ-নদীর ওপর ভীষণ বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এখন এই অঞ্চলে চাষাবাদের জন্য মূলত ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
ভৈরব নদ সংস্কার আন্দোলনের উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, শুধু গঙ্গাই নয়, এই অঞ্চলের আরেকটি প্রধান নদী ভৈরবেও বাঁধ দিয়ে ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। ভারতের হাদড়াগাড়িতে এই বাঁধটি দেওয়া হয়েছে।
ফারাক্কা বাঁধ
পশ্চিম হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে উৎপন্ন গঙ্গা নদীর দৈর্ঘ্য দুই হাজার ৭০৪ কিলোমিটার। বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই নদীটি বাংলাদেশে ‘পদ্মা’ নামে অভিহিত। কলকাতা বন্দর রক্ষার উদ্দেশে ভারত তার দেশের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদহ ও মুর্শিদাবাদের ফারাক্কা পয়েন্টে গেল শতাব্দীর ষাটের দশকে বাঁধ নির্মাণ শুরু করে। মুখ্য উদ্দেশ্য, পদ্মাকে বঞ্চিত করে ভাগীরথী-হুগলি নদীতে পানি সরবরাহ করা। এর জন্য ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ ফিডার ক্যানেলও তৈরি করে দেশটি।
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ১৯৭৫ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধির আলোচনার পর ভারতকে ফারাক্কা পয়েন্টে দশ দিনের জন্য পরীক্ষামূলক ৩১০ থেকে ৪৫০ কিউসেক পানি প্রত্যাহারের অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু হায়! সেই পরীক্ষামূলক পানি প্রত্যাহারের দশ দিন আজ পর্যন্ত শেষ হয়নি।
ভারতকে পানি প্রত্যাহারে বিরত রাখতে ব্যর্থ হয়ে বাংলাদেশ বিষয়টি জাতিসংঘে উপস্থাপন করে। জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৭ সালের ৫ নভেম্বর ভারত-বাংলাদেশ প্রথম পাঁচ বছর মেয়াদি পানিবণ্টন চুক্তি হয়। এরপর কয়েক দফা স্বল্পমেয়াদি চুক্তি হলেও ১৯৮৯ সালের শুষ্ক মৌসুম থেকে ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহার করতে থাকে। এরপর ১৯৯৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে সর্বনিম্ন ৩৫ হাজার কিউসেক পানি দিতে বাধ্য ভারত। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ভারত চুক্তি লঙ্ঘন করে গঙ্গা নদীর পানি ইচ্ছানুযায়ী প্রত্যাহার করে। বাংলাদেশের হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে প্রমত্তা পদ্মা শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে সরু খালে পরিণত হয়।
পদ্মা ব্যারাজ
পদ্মার পানি থেকে যখন বাংলাদেশকে বছরের পর বছর বঞ্চিত করা হচ্ছে, তখন বিকল্প পথ খুঁজতে থাকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র। বিশেষজ্ঞরা মতামত দেন, পদ্মা নদীতে রিজার্ভার তৈরির, যার মাধ্যমে বর্ষা মৌসুমের বাড়তি পানি জমিয়ে রেখে শুষ্ক মৌসুমে তা কাজে লাগানো যায়। দীর্ঘদিন ধরে নানা সমীক্ষা, আলোচনা-সমালোচনার পর অবশেষে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অল্পকিছুদিনের মধ্যে পদ্মা ব্যারাজ তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়) প্রকল্পটি প্রস্তাব করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। চলতি বছর থেকে শুরু করে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)। প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। তবে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে। প্রথম ধাপের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। পুরো অর্থায়ন সরকারি তহবিল থেকেই করা হবে।
সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে দাবি করা হয়েছে, ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে পদ্মা নদীতে প্রায় দুই হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে। সংরক্ষিত পানি দিয়ে পাঁচটি নদীর পানিপ্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করা হবে। এগুলো হলো, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল এবং ইছামতী নদী। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীতে প্রায় ৮০০ কিউসেক মিটার পানি সরবরাহ করা হবে। এতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে রাজবাড়ীর পাংশায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। ব্যারাজটিতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট, মাছ চলাচলের জন্য দুটি ফিশ পাস, একটি নেভিগেশন লক এবং গাইড ও সংযোগ বাঁধ।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, পদ্মা ব্যারাজ ও গড়াই অফ-টেক এলাকায় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এসব কেন্দ্র থেকে মোট ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপের আওতায় ১৩৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ গড়াই-মধুমতি নদী এবং ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার হিসনা নদী ব্যবস্থার ড্রেজিং ও পুনঃখননের কাজও করা হবে। অন্যান্য কাজের মধ্যে রয়েছে ১৫টি স্পিলওয়েসহ গড়াই অফ-টেক, ফিশ পাস, নেভিগেশন লক ও ৩৬ দশমিক ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ। পাশাপাশি চন্দনা অফ-টেকে চারটি স্পিলওয়ে, হিসনা অফ-টেকে পাঁচটি স্পিলওয়ে এবং ১৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ অ্যাফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণ করা হবে। হিসনা অফ-টেককে হিসনা-মাথাভাঙ্গা নদী ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি গঙ্গা নদীব্যবস্থা থেকে পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে পলি জমা কমানো ও শুষ্ক মৌসুমে পানি সরবরাহ নিশ্চিতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
প্রকল্প প্রস্তাবে আরো বলা হয়েছে, প্রকল্পে কৃষি ও মৎস্য খাতে উৎপাদন বৃদ্ধিতেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর ধান উৎপাদন প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন এবং মৎস্য উৎপাদন প্রায় দুই লাখ ৩৪ হাজার টন বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাংলাদেশের মোট এলাকার প্রায় ৩৭ শতাংশ, যা দেশের চারটি বিভাগের ২৬ জেলার ১৬৩ উপজেলায় বিস্তৃত। তবে প্রথম ধাপ বাস্তবায়িত হলে খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের অবহেলিত অন্তত ১৯ জেলা ও ১২০ উপজেলা সরাসরি উপকৃত হবে। জেলাগুলো হলো, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ি, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং পিরোজপুর। দ্বিতীয় ধাপে অতিরিক্ত সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ এবং চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কাজ করা হবে।