সম্পাদকীয়
সীমান্ত সুরক্ষা এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো যেকোনো রাষ্ট্রের বৈধ দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—কোনো ব্যক্তিকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করার আগে যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। ভারতের সুপ্রিম কোর্টে পশ্চিমবঙ্গের এক নারীকে বাংলাদেশে ‘পুশ আউট’ করার অভিযোগ নিয়ে যে মামলা উঠেছে, তা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের এই মৌলিক প্রশ্নটিই সামনে এনেছে।
শাহিন ফকিরের করা ‘হেবিয়াস করপাস’ আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, তার মা সাহিদা ফকিরকে মুম্বাইয়ে আটক করার পর শতাধিক ঘণ্টা হেফাজতে রাখা হয়। পরে তাকে বিএসএফের হাতে তুলে দিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। আবেদনের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, তাকে ভারতীয় নাগরিকত্বের দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য যথাযথ সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং কোনো বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তার জাতীয়তা নির্ধারণ করা হয়নি। সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে নোটিস দিয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, আদালত এখনো অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করেনি।
মামলাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আবেদনকারীর দাবি অনুযায়ী ওই নারীর ভারতীয় নাগরিকত্বের পক্ষে পারিবারিক নথি রয়েছে এবং ভোটার তালিকা থেকে তার নাম বাদ পড়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়াও চলমান। এসব নথি শেষ পর্যন্ত নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ কি না, তা আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই যাচাই শেষ হওয়ার আগেই একজন ব্যক্তিকে সীমান্ত দিয়ে ভিনদেশে ঠেলে দেওয়া কতটা ন্যায়সঙ্গত?
নাগরিকত্ব কোনো অনুমাননির্ভর পরিচয় নয়; এটি একটি আইনগত মর্যাদা। ফলে কাউকে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে তার বক্তব্য শোনা, নথি যাচাই করা এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকারের সুযোগ রাখা জরুরি। বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশের মতো ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশে, যেখানে মানুষের দীর্ঘদিনের আন্তঃসীমান্ত সামাজিক ও পারিবারিক যোগাযোগ রয়েছে, সেখানে পরিচয় নির্ধারণে সামান্য প্রশাসনিক ভুলও একজন মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করতে পারে।
এই মামলায় ২০২৫ সালের মে মাসে জারি করা সংশ্লিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর এবং ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেন অর্ডার, ২০২৫-এর বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আবেদনকারীর আইনজীবীদের অভিযোগ, এসব ব্যবস্থায় প্রশাসনের হাতে এমন ক্ষমতা তৈরি হয়েছে, যার অপব্যবহার হলে প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকও ভুলভাবে বহিষ্কারের শিকার হতে পারেন। এসব অভিযোগের সাংবিধানিক বৈধতা অবশ্য আদালতের বিচারাধীন বিষয়।
রাষ্ট্রের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের অধিকার যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি সেই ক্ষমতার প্রয়োগও আইনের ঊর্ধ্বে হতে পারে না। জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার সঙ্গে ব্যক্তির মৌলিক অধিকার ও যথাযথ প্রক্রিয়ার সুরক্ষার ভারসাম্যও বজায় রাখতে হবে।
সাহিদা ফকিরের মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতই দেবে। তবে ঘটনাটি একটি বৃহত্তর শিক্ষা সামনে আনে: ‘পুশ আউট’ কোনো নাগরিকত্ব নির্ধারণের বিকল্প হতে পারে না। একজন মানুষ সত্যিই বিদেশি হলে আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় তাকে প্রত্যাবাসন করা যেতে পারে; কিন্তু নাগরিকত্ব নিয়েই যদি বিরোধ থাকে, তাহলে আগে সেই বিরোধের নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।
আইনের শাসন রক্ষা করে রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার। তাই ভারত অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে চায়, ভালো কথা। কিন্তু নিজ দেশের নাগরিককে যদি ভিনদেশে ঠেলে দেয়, তাহলে তা কোনো মতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
স্মরণ করা যেতে পারে যে, ভারত এমন একটি দেশ, যার কোনো প্রতিবেশির সাথে সুসম্পর্ক নেই। উগ্র হিন্দুত্ববাদী শক্তি দেশটির রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর থেকে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবাংলায় বিজেপির ক্ষমতারোহণের পর থেকে প্রতিবেশি বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে মানুষকে ঠেলে দেওয়ার অমানবিক কার্যক্রম বেড়ে যাওয়া পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাচ্ছে।
ভারত এখন সুপার পাওয়ার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু প্রতিবেশির সাথে সুআচরণ ছাড়া কোনোভাবেই এটা সম্ভব নয়।