আল আমিন মুক্ত
বর্তমানে বিশ্বে জ্বালানি তেলের বাজার অস্থির। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবন এখন বিদ্যুৎ ও আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে, সরবরাহ লাইনে সামান্য টান পড়লেই থমকে যায় দেশের অর্থনীতির চাকা। বিশেষ করে পরিবহন খাতে পেট্রোল, ডিজেল ও অকটেনের যে বিপুল চাহিদা, তা মেটাতে রাষ্ট্রকে গুনতে হচ্ছে বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা। এই সংকটময় মুহূর্তে আমাদের বিকল্প এবং টেকসই যাতায়াত ব্যবস্থা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। আর সেই বিকল্পের নাম হতে পারে বাইসাইকেল।
আমাদের দেশের শহরগুলোর আয়তন খুব বেশি বড় নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্মস্থল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাসা থেকে পাঁচ থেকে দশ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে থাকে। অথচ এই সামান্য পথ পাড়ি দিতে আমরা নির্ভর করছি মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা বিদ্যুৎচালিত ইজিবাইকের ওপর। এতে যেমন জ্বালানি পুড়ছে, তেমনি বাড়ছে শব্দ ও বায়ুদূষণ। এই চক্র থেকে বের হতে সাইকেল হতে পারে এক জাদুকরী সমাধান।
শারীরিক সক্ষমতা ও জনস্বাস্থ্য
একজন মানুষ যদি প্রতিদিন গড়ে ২০-৩০ মিনিট সাইকেল চালান, তবে তার কার্ডিও-রেসপিরেটরি বা হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের কার্যক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়। আধুনিক জীবনযাত্রায় আমরা যখন কায়িক শ্রম কমিয়ে দিচ্ছি, তখন সাইকেল চালানো হতে পারে সেরা ব্যায়াম। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি দারুণ কার্যকর। সাইকেলে চড়ে স্কুলে গেলে তাদের শারীরিক সক্রিয়তা বাড়বে, যা মেটাবলিজম উন্নত করে খাওয়ার আগ্রহ বাড়াবে এবং তাদের একটি প্রাণবন্ত প্রজন্ম হিসেবে গড়ে তুলবে।
পরিবেশ ও যানজট নিরসন
শহরগুলোতে যানজট এখন নিত্যসঙ্গী। ব্যক্তিগত গাড়ি বা বড় যানবাহনের বদলে সাইকেল জনপ্রিয় হলে রাস্তার ওপর চাপ কমবে। সাইকেল কোনো কার্বন নিঃসরণ করে না, ফলে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে। কার্বনমুক্ত শহর গড়তে সাইকেলের চেয়ে ভালো বিকল্প আর নেই।
সরকারের করণীয় ও নীতিনির্ধারণ
তবে কেবল জনগণের সচেতনতায় এই পরিবর্তন সম্ভব নয়। এখানে রাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ ও সহযোগিতা প্রয়োজন। যেমন-
পৃথক লেন ও নিরাপত্তা: শহরের প্রধান সড়কগুলোতে বাইসাইকেলের জন্য আলাদা এবং নিরাপদ ‘ডেডিকেটেড লেন’ তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে স্কুল সময়ে হাইওয়ে বা মোড়গুলোতে শতভাগ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে যেন শিক্ষার্থীরা নিরাপদে যাতায়াত করতে পারে।
প্রণোদনা ব্যবস্থা: সরকারি-বেসরকারি অফিসে যারা সাইকেল ব্যবহার করবেন, তাদের বিশেষ যাতায়াত ভাতা বা বোনাসের আওতায় আনা যেতে পারে। এটি মানুষকে ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়তে উৎসাহিত করবে।
কর্মসংস্থান সমন্বয়: জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শ্রমঘন রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চল এবং ছোট-মাঝারি কারখানা গড়ে তুলে রিকশা ও অটোচালকদের সেখানে সম্পৃক্ত করা একটি অত্যন্ত দূরদর্শী ও টেকসই অর্থনৈতিক পরিকল্পনা হতে পারে। এর মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক খাতের অনির্দিষ্ট আয়ের শ্রমিকদের উৎপাদনশীল শিল্প চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।
জ্বালানি সাশ্রয়, পরিবেশ দূষণ রোধ এবং একটি সুস্থ জাতি গঠনের তিনটি লক্ষ্যই পূরণ হতে পারে বাইসাইকেল বিপ্লবের মাধ্যমে। যখন সরকার অবকাঠামো দেবে এবং সাধারণ মানুষ নিজেদের মানসিকতা পরিবর্তন করবে, তখনই আমরা একটি বাসযোগ্য সবুজ শহর পাবো। সংকটের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সম্ভাবনার বীজ। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের যাতায়াত ব্যবস্থায় ‘সক্রিয় পরিবহন’ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
লেখক: স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী
শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগ, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়