যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

ইন্টারনেট খরচের তুলনায় সেবা অপ্রতুল কেন

পার্থিব আহসান

প্রকাশ : বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১২:০০ পিএম
ইন্টারনেট খরচের তুলনায় সেবা অপ্রতুল কেন

মোবাইল ফোন এখন আর বাড়তি বা বিলাসবহুল কোনো সুবিধা নয়, বরং এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনলাইন ক্লাস, ব্যাংকিং লেনদেন, চাকরির আবেদন, চিকিৎসাসেবা, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবা গ্রহণ কিংবা ছোট ব্যবসার হিসাব সবকিছুতেই এখন মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের ওপর নির্ভর করতে হয়। ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ সেবা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠলেও সেই সেবার মান, মূল্য ও গ্রাহক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন বেড়েছে। গত সাড়ে পাঁচ বছরে দেশের চারটি প্রধান মোবাইল অপারেটরের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) জমা পড়েছে ৬৬ হাজার ৭০৫টি অভিযোগ। অভিযোগের এই বিপুল সংখ্যা মোবাইল সেবার মান নিয়ে গ্রাহকদের অসন্তোষের চিত্রই তুলে ধরে। নেটওয়ার্কের সমস্যা ও নিম্নমানের সেবা নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগের সংখ্যাই বেশি।

বিপুলসংখ্যক অভিযোগ জমা হলেও গ্রাহকের সেবায় বাস্তবে কতটা পরিবর্তন এসেছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে স্বস্তির চেয়ে হতাশার চিত্রই বেশি চোখে পড়ে। একদিকে বৃদ্ধি পাচ্ছে ডেটার দাম, অন্যদিকে নেটওয়ার্কের দুর্বলতা, কলড্রপ ও সেবাজনিত নানা ধরনের ভোগান্তি এখন গ্রাহকের নিত্যসঙ্গী। প্রশ্ন হলো, ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থা যখন মানুষের জীবন ও অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, তখন সেই সেবার জন্য গ্রাহককে কেন বারবার ভোগান্তির মুখে পড়তে হবে?

গ্রাহকের সবচেয়ে বড় অভিযোগগু হলো ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য। বিটিআরসির মূল্য পর্যালোচনায় ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদের ডেটা প্যাকেজে চার অপারেটরের ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির তথ্য উঠে এসেছে। এতে মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি ডেটা ব্যবহারকারীদের মাসিক ব্যয় বেড়েছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করছে। বিষয়টি আরও প্রশ্নের জন্ম দেয়, কারণ সরকার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যান্ডউইথডের দাম কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে এবং অপারেটরদের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সুবিধাও নিশ্চিত করা হয়েছে। এরপরও গ্রাহক পর্যায়ে ডেটার দাম কমার বদলে বেড়েছে। অপারেটরদের ভাষ্য, ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিচালন ব্যয়ের চাপ থেকেই প্যাকেজের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তবে ব্যান্ডউইথডের দাম কমানো ও প্রযুক্তিগত সুবিধা বাড়ানোর সুফল গ্রাহক পর্যায়ে কেন প্রতিফলিত হলো না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ বহন করতে হচ্ছে গ্রাহকদেরই।

দাম বাড়লেও সেবার মানে উন্নতির তেমন ছাপ মেলেনি বলে অভিযোগ আছে। সম্প্রতি স্বাধীনভাবে করা প্রথম মান যাচাইয়ে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে কলড্রপের হার নিয়ে অপারেটরদের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিজস্ব পরীক্ষার ফলাফলে উল্লেখযোগ্য ফারাক পাওয়া গেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই ব্যবধান কয়েক গুণ। এমনকি দেশের অনেক উপজেলায় শীর্ষ অপারেটরদের ন্যূনতম নেটওয়ার্ক কভারেজও নেই। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কারিগরি তথ্য সরবরাহে গড়িমসির অভিযোগও রয়েছে। তথ্য সরবরাহ না করায় এতদিন নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অনেকাংশে অপারেটরদের দেওয়া তথ্যের ওপরই নির্ভর করতে হয়েছে। ফলে বিষয়টি শুধু নেটওয়ার্ক ও সেবার কারিগরি দুর্বলতাকেই সামনে আনে না, তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।

নেটওয়ার্কের দুর্বলতার সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণগুলোর একটি হলো কলড্রপ। গত এক বছরেই চার অপারেটরের নেটওয়ার্কে কোটি কোটি বার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথনের মাঝেও হঠাৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া গ্রাহকদের জন্য নিয়মিত ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই সংকটের মাত্রা শহর ও গ্রামের মধ্যে এক নয়। শহরকেন্দ্রিক আলোচনায় নেটওয়ার্কের নানা সমস্যা সামনে এলেও গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকার দুর্বল সংযোগ অনেকটাই আড়ালে থেকে যাচ্ছে। ফোরজি প্রসারের বড় বড় বিজ্ঞাপন থাকলেও গ্রামীণ এলাকায় গ্রাহকরা থ্রিজি বা টুজির গতি পেতেও হিমশিম খাচ্ছেন। শহরের তুলনায় গ্রামে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখনো অর্ধেকেরও কম, যা চরম ডিজিটাল বৈষম্য তৈরি করেছে।

পরীক্ষার জরুরি ফাইল ডাউনলোড করতে শিক্ষার্থীর ছোটাছুটি, ফাইল আপলোড করতে না পেরে ফ্রিল্যান্সারের গ্রাহক হারানো কিংবা রোগীর রিপোর্ট পাঠাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট হওয়ার মতো ঘটনাগুলো নেটওয়ার্কের দুরবস্থারই চরম প্রতিফলন। বিশেষ করে দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় চাহিদার তুলনায় টাওয়ারের চরম ঘাটতি শহর ও গ্রামের মধ্যে ব্যাপক ডিজিটাল বৈষম্য তৈরি করেছে।

সমস্যার মূল শেকড়ের বড় অংশ লুকিয়ে আছে বাজারে সীমিত প্রতিযোগিতা এবং নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতায়। দেশে মোবাইল অপারেটরের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় গ্রাহকের হাতে বিকল্পও তুলনামূলক কম। তাই অপারেটরগুলো নিজেদের ব্যবসায়িক কৌশল অনুযায়ী বিভিন্ন মেয়াদ, মূল্য ও শর্তের প্যাকেজ বাজারে নিয়ে আসে। এত প্যাকেজের ভিড়ে কোনটি প্রকৃত অর্থে সাশ্রয়ী ও প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তা একজন সাধারণ গ্রাহকের পক্ষে বুঝে ওঠা একপ্রকার অসম্ভব কাজ।

গ্রাহকদের আরেকটি বড় ভোগান্তি হলো প্যাকেজের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অব্যবহৃত ডেটারও মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া। অর্থ দিয়ে ডেটা কেনার পরও নানা কারণে অনেক গ্রাহক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারেন না। কর্মব্যস্ততা, অসুস্থতা, বিদ্যুৎ বা নেটওয়ার্ক সমস্যা কিংবা একাধিক সিম ব্যবহারের কারণে ডেটার একটি অংশ অব্যবহৃত থেকে যায়। এর ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ডেটা গ্রাহকদের কোনো কাজে না এসেই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়, যার আর্থিক মূল্যও কম নয়। এ সমস্যা সমাধানে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডেটা রোলওভারের নির্দেশনা দিলেও একই প্যাকেজের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে পুনরায় প্যাকেজ কেনার শর্ত রাখা হয়েছে। ফলে সময়সীমার এই শর্ত অনেক গ্রাহকের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সুযোগ থাকলেও শর্তের কারণে ডেটা রোলওভারের সুবিধা এখনো প্রত্যাশিতভাবে কাজে আসছে না।

এই সমস্যা সমাধানে খুব জটিল কোনো উদ্যোগের প্রয়োজন নেই। বিশ্বের অনেক দেশেই ডেটা রোলওভার সুবিধা চালু রয়েছে। এর ফলে নির্দিষ্ট মেয়াদে অব্যবহৃত ডেটা পরবর্তী মেয়াদে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত হয় এবং গ্রাহক তা পরবর্তীতে ব্যবহার করতে পারেন। বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারের মতো কেনা ডেটাও ডিজিটাল ব্যালেন্স হিসেবে জমা থাকা উচিত, যা মেয়াদ শেষ হওয়ার ভয়ে নষ্ট না হয়ে প্রয়োজনমতো ব্যবহার করা যাবে। নির্দিষ্ট মেয়াদের সাশ্রয়ী প্যাকেজের পাশাপাশি তুলনামূলক বেশি মূল্যে মেয়াদবিহীন ডেটা ব্যবহারের সুযোগও রাখা যেতে পারে। এতে গ্রাহক নিজের প্রয়োজন ও ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত প্যাকেজ বেছে নিতে পারবেন।

গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষায় প্রতিটি অপারেটরের বিলিং ব্যবস্থা নিয়মিত স্বাধীনভাবে অডিট করা দরকার, যাতে কেনা মিনিট ও ডেটার হিসাব নিয়ে কোনো প্রশ্ন না থাকে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য স্বাধীন ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শুধু অভিযোগ গ্রহণ করলেই হবে না, সমাধান না হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে নেটওয়ার্ক অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় প্রকৃত ফোরজি সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু কাগজে কভারেজের হিসাব দেখালেই গ্রাহকের বাস্তব অভিজ্ঞতা বদলাবে না। প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবার মান নিয়মিত যাচাই করে নির্ধারিত মান পূরণে ব্যর্থ অপারেটরদের বিরুদ্ধে জরিমানাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য বড় কোনো জটিল কাঠামোর প্রয়োজন নেই। বিদ্যমান ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়েই নজরদারি ও জবাবদিহি বাড়ানো সম্ভব। ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থা প্রস্তুতই আছে; সংকট কাটাতে এখন কেবল সরকারের সঠিক সিদ্ধান্ত ও গ্রাহকবান্ধব মানসিকতা প্রয়োজন।

একটি শক্তিশালী ডিজিটাল অর্থনীতি গড়তে টেলিযোগাযোগ খাতের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ২০২৬ সালের এপ্রিলে বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ফোরজি গ্রাহকের সংখ্যা ১১ কোটির বেশি এবং মোবাইল ব্রডব্যান্ড গ্রাহকও দশ কোটির ওপরে ছিল। এই খাতে অস্বচ্ছতা, উচ্চমূল্য ও নিম্নমানের সেবা অব্যাহত থাকলে দেশের ডিজিটাল অগ্রগতির পথও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর দেশ গড়ার এই সময়ে টেলিযোগাযোগ সেবাকে ঘিরে গ্রাহকের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে গ্রাহকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি টেলিযোগাযোগ অপারেটরদের ব্যবসায়িক বাস্তবতা ও স্বার্থকেও বিবেচনায় রাখতে হবে।

লেখক: যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)