সম্পাদকীয়
প্রেসক্লাব যশোরের দ্বিবার্ষিক নির্বাচন শেষ হয়েছে। সভাপতি পদে দৈনিক যশোর সম্পাদক জাহিদ হাসান টুকুন পুনর্নির্বাচিত এবং সাধারণ সম্পাদক পদে মানবজমিনের স্টাফ রিপোর্টার নূর ইসলাম নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যান্য পদেও নির্বাচিত হয়েছেন সাংবাদিক সমাজের প্রতিনিধিত্বকারীরা। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচন সংগঠনের গণতান্ত্রিক চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এখন দেখার বিষয়—নতুন নেতৃত্ব কীভাবে এই আস্থার প্রতিফলন ঘটাবে?
নির্বাচনে জয় পাওয়া এক বিষয়, আর সেই জয়ের মর্যাদা রক্ষা করা অন্য বিষয়। নেতৃত্বের সাফল্য ভোটের ব্যবধানে নয়; সংগঠন পরিচালনায় স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীলতা, দূরদর্শিতা ও ঐক্যের পরিচয় দেওয়ার মধ্যেই তার প্রকৃত মূল্যায়ন। নির্বাচিত কমিটিকে এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই দায়িত্ব পালন করতে হবে।
প্রেসক্লাব যশোর শুধু সাংবাদিকদের মিলনকেন্দ্র নয়; এটি যশোরের সাংবাদিকতার দীর্ঘ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তাই এর নেতৃত্বের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে স্থানীয় সাংবাদিকতার পরিবেশ ও মানও যুক্ত। প্রেসক্লাবকে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা বলয়ের প্রভাবমুক্ত রেখে একটি শক্তিশালী পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালনা করাই হওয়া উচিত নতুন কমিটির প্রধান অঙ্গীকার।
নির্বাচনে যারা পরাজিত হয়েছেন, তারাও সংগঠনেরই অংশ। তাদের অভিজ্ঞতা, মতামত ও অবদানকে কাজে লাগানো প্রয়োজন। নির্বাচনের পর বিজয়ী-পরাজিতের বিভাজন দ্রুত দূর করে ঐক্যের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ভিন্নমতকে জায়গা দেওয়া এবং সমালোচকদের প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখাও নেতৃত্বের বড় পরীক্ষা।
আজকের সাংবাদিকতা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ডিজিটাল মাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, তথ্য যাচাই ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন বাস্তবতায় সাংবাদিকদের দক্ষতা বাড়াতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা প্রয়োজন। বিগত আহ্বায়ক কমিটি ৩৬ জন সাংবাদিককে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে সংগঠনের কার্যক্রমে অংশগ্রহণের; যাদের অধিকাংশই তরুণ। এই তরুণ সাংবাদিকদের সঠিক পথে পরিচালনা করা এবং অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের জ্ঞান কাজে লাগানোর ক্ষেত্রেও প্রেসক্লাবকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা ও নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। সংবাদ সংগ্রহে সাংবাদিকরা যাতে হয়রানি বা অযাচিত চাপের শিকার না হন, সে বিষয়ে প্রেসক্লাবকে সোচ্চার হতে হবে। তবে অধিকার রক্ষার পাশাপাশি পেশাগত নীতি, দায়িত্বশীলতা ও বস্তুনিষ্ঠতার প্রশ্নেও কোনো আপস করা যাবে না।
সংগঠনের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনেও স্বচ্ছতা জরুরি। আর্থিক ব্যবস্থাপনা, সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা, ক্লাবের সম্পদের ব্যবহার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে কোনো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হতে পারে না। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত নতুন নেতৃত্বের লক্ষ্য।
যশোরে সংবাদপত্রসেবীদের এই শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের নবনির্বাচিত নেতৃত্বকে অভিনন্দন জানিয়ে বিভিন্ন সংগঠন বিবৃতি দিয়েছে। অভিনন্দন বার্তায় তারা সাংবাদিকদের ঐক্য, মর্যাদা ও সংহতি রক্ষার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে। এই প্রত্যাশা যথার্থ। সাংবাদিক সমাজ বিভক্ত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্বাধীন ও জনমুখী সাংবাদিকতার পরিবেশ।
নতুন কমিটির সামনে তাই প্রত্যাশাও অনেক। আগামী দুই বছরের কাজই শেষ পর্যন্ত তাদের মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি হবে। প্রেসক্লাব যশোরকে বিভাজনের ঊর্ধ্বে রেখে একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও পেশাদার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার এখনই সময়।
নির্বাচন শেষ। প্রতিদ্বন্দ্বিতার অধ্যায়ও শেষ হওয়া উচিত। এখন সময় কাজ, ঐক্য ও প্রেসক্লাবের ঐতিহ্যকে আরও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর। আশা করি, নবনির্বাচিত নেতৃত্ব এই কাজে সফল হবে।