সম্পাদকীয়
দেশের প্রধান স্থলবন্দর বেনাপোল। ভারত-বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে এই বন্দরের কার্যক্রমের সঙ্গে দেশের রাজস্ব, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির বড় একটি অংশ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। ফলে বেনাপোল বন্দরে পণ্য খালাস, পরীক্ষণ ও শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা রাষ্ট্রের রাজস্ব সুরক্ষা ও বাণিজ্য ব্যবস্থাপনার জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে বন্দরের বিভিন্ন শেডে পণ্য খালাস ও শুল্কায়ন নিয়ে যে অভিযোগগুলো সামনে এসেছে, সেগুলোর ধরনও উদ্বেগজনক। ঘোষণার চেয়ে বেশি পণ্য থাকা, পণ্যের প্রকৃত মূল্য বা পরিমাণ গোপন করা, উচ্চ শুল্কের পণ্যের পরিবর্তে কম শুল্কের পণ্য ঘোষণা, দ্রুত পরীক্ষণের মাধ্যমে খালাস এবং শুল্ক পরিশোধের আগেই পণ্য বের করে নেওয়ার মতো অভিযোগ উঠেছে। সবচেয়ে আলোচিত ২৯ নম্বর শেড থেকে তিন ট্রাক পণ্য শুল্ক পরিশোধ না করে বের করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ। এই অভিযোগ সত্য হলে এটি বন্দরের নিরাপত্তা, কাস্টমস নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার গুরুতর দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
অভিযোগ আর প্রমাণ এক বিষয় নয়—একথা সবাই জানে। কিন্তু অভিযোগ কাদের বিরুদ্ধে উঠছে, অভিযুক্তদের ট্র্যাকরেকর্ড কী- এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তের মাধ্যমে এই স্তর পার করতে পারলে কীভাবে পণ্য বের হলো, কোথায় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে অথবা অভিযোগ কেন উঠছে—এসব প্রশ্নের উত্তর মেলানো সহজ হবে। এ ক্ষেত্রে সিসিটিভি ফুটেজ, চালানের নথি, পরীক্ষণ প্রতিবেদন, শুল্কায়ন তথ্য, গেট পাস, স্কেল রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টনের তথ্য পর্যালোচনা করা জরুরি। প্রয়োজনে ডিজিটাল রেকর্ডও সংরক্ষণ ও পরীক্ষা করতে হবে।
বেনাপোল কাস্টম হাউসের রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যানও বিষয়টির গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায়ে যে বড় ঘাটতি হয়েছে, তার কারণ অনুসন্ধান প্রয়োজন। রাজস্ব ঘাটতির পুরো দায় অনিয়মের ওপর চাপানো যেমন যুক্তিসঙ্গত নয়, তেমনি অনিয়মের অভিযোগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কারণে আমদানি কমে যাওয়া, পণ্যের ধরন, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, শুল্কনীতি ও বাণিজ্য প্রবাহসহ সব কারণ বিশ্লেষণ করেই প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করতে হবে।
আটক পণ্য ত্রাণ হিসেবে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগও অত্যন্ত গুরুতর। রাষ্ট্রীয় সম্পদ বা আটক পণ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা, নথিভুক্তি ও জবাবদিহি থাকা আবশ্যক। এ ধরনের পণ্য পরিবহনে একাধিক স্তরের যাচাই এবং দায়িত্ব হস্তান্তরের স্পষ্ট প্রমাণ থাকা উচিত, যাতে কোনো সুযোগের অপব্যবহার না হয়।
সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স ভাড়া নেওয়া, একটি চক্রের মাধ্যমে অনিয়মের সুযোগ তৈরি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশের যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোও যথাযথভাবে যাচাই করা দরকার। অভিযোগ সত্য হলে শুধু ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা যথেষ্ট হবে না; যে কাঠামোগত দুর্বলতা অনিয়মের সুযোগ তৈরি করে, সেটিও চিহ্নিত করে সংস্কার করতে হবে।
কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে কয়েকজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়েছে এবং তদন্ত কমিটি গঠন করেছে—এটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। কিন্তু তদন্ত যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। অপরাধ প্রমাণিত হলে দায়িত্বের অবস্থান বা পরিচয় বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে নির্দোষ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
বেনাপোল বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অনিয়ম প্রতিরোধে প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ঝুঁকিভিত্তিক পণ্য পরীক্ষা, স্বয়ংক্রিয় শুল্কায়ন, সিসিটিভি ও ডিজিটাল রেকর্ডের কার্যকর ব্যবহার এবং কর্মকর্তাদের নিয়মিত দায়িত্ব পরিবর্তন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন বন্দর ব্যবস্থাপনার ওপর অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারে।
জাতীয় সংসদে বিষয়টি উত্থাপিত হওয়ায় এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব আরও বেড়েছে। বেনাপোলের অনিয়মের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত দায়ীদের শনাক্তকরণ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সংস্কারই হতে পারে জনগণের অর্থ ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর পথ। বন্দর চলবে নিয়মে, ব্যক্তি বা সিন্ডিকেটের প্রভাবে নয়—এটাই হওয়া উচিত প্রশাসনের স্পষ্ট অঙ্গীকার।