মো. মিজানুর রহমান
আমরা অধিকাংশ মানুষই যখন কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর প্রশংসা করি তখন আমাদের ভাষা এরূপ হয়- ‘এর মতো ভালো আর হয় না।’ আবার যখন নিন্দা করি তখন ‘এর মতো খারাপ আর হয় না।’ অর্থাৎ প্রশংসায় এবং নিন্দায় আমরা খারাপ ও ভালোকে মধ্যম মানে নিয়ে যেতে পারি না। ‘কিচ্ছু হয়নি’ অথবা ‘চমৎকার’ এই আমাদের মন্তব্য। জাতি হিসেবে এটা আমাদের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমার মতামত দেওয়ার মতো তেমন যোগ্যতা আছে বলে মনে করি না। তবুও আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা/পদ্ধতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মতামত বা ধারণা হতে আমি যা জেনেছি, তার কিছু উল্লেখ করছি-
১. যারা ৫০০ অবজেকটিভ প্রশ্ন পড়ে এসএসসি পাশ তাদের মাথায় আর কী থাকবে?
২. তখন নকলের যুগ ছিলো, সবাই পাস। তারা কী বুঝবে?
৩. আমাদের সময় এইট পাস মানে এখনকার যুগে বিএ পাসের সমান।
৪. সে যুগে অধিকাংশের মেধা থাকলেও অর্থাভাবে পড়তে পারেনি।
৫. আমার ছেলে/মেয়ের মেধা আছে, কিন্তু পড়তে চায় না।
৬. এতো বই, বাচ্চারা পড়তে পারে? বইয়ের বোঝায় বাচ্চাদের মেরুদণ্ড বেঁকে যাচ্ছে।
৭. এখনকার বাচ্চারা কিচ্ছু শিখছে না। আমাদের সময় ছিলো পড়ালেখা।
৮. বাচ্চাদের বেত্রাঘাত করার প্রয়োজন নেই। মেরে বাচ্চা মানুষ হয়?
৯. আমাদের সময় শিক্ষকেরা আমাদের মেরে হাত ভেঙে ফেলতেন।
১০. এখন শুধু মুখস্থ বিদ্যা। আমরা কিছু না বুঝলে ছাতিয়ানতলা হতে চীন পর্যন্ত চলে যেতাম বুঝতে।
আমরা প্রতিনিয়ত চলমান শিক্ষাব্যবস্থাকে পূর্ববর্তী ব্যবস্থার সাথে তুলনা করে নিজেদেরকে উত্তম বিবেচনা করি এবং পরবর্তী জনারেশনকে অধম হিসেবে গণ্য করি। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে এই আমাদের সমালোচনা। অথচ উন্নত দেশগুলো শিক্ষা নিয়ে গবেষণা করে নিজেদের পদ্ধতিকে যুগোপযোগী করে নিয়েছে। আর আমরা শুধু পুরনোকে আঁকড়ে চলতে চাই। প্লেটোর শিক্ষাতত্ত্ব আমরা অনেকেই পড়েছি। কোন কোন দেশে সেই তত্ত্ব চালু আছে? কোনো দেশেই নেই। সকল দেশই তাদের দেশের স্বার্থে তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন এনেছে। উন্নত সকল দেশেই কর্মমুখী শিক্ষার প্রতি গুরত্বারোপ করা হয়। আমাদের দেশে শিক্ষিতের হার বেড়েছে। স্বাবলম্বী হওয়া কয়জনে শিখেছে? আমরা চাকরির বাইরে এখন পর্যন্ত কিছুই ভাবতে পারি না।
আমাদের দেশে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, ব্যারিস্টার, জজ, বিসিএস ক্যাডার—এ জাতীয় বড় বড় পদ/পেশাগুলোকেই আমরা সন্তানদের লক্ষ্য হিসেবে ধরিয়ে দিই। সন্তানরা এই লক্ষ্য নিয়ে পড়ালেখা শেষ করলেও এসকল পদে সরকারের নিয়োগ থাকে হাতে গোনা। তারপর যারা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারে তারা সফল হিসেবে পরিচয় পায়; যারা পারে না তারা ব্যর্থ হিসেবে পরিচিত হয় এবং তাদের অনেকেই হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে অস্বাভাবিক জীবনে ঢুকে যায়। তাদেরকে জীবনের যে একটা মধ্যম মান আছে তা দেখতে দেওয়া হয় না। আমরা সামগ্রিক ভাবনাটা ভাবতে শিখিনি। যেকোনো অবস্থাকেই আমরা সর্বোচ্চ অথবা সর্বনিম্ন বিবেচনা করি। যেখানে উন্নত বিশ্বে কোনো কাজকেই ছোট করে দেখা হয় না সেখানে জীবনের মধ্যম মান ভাবতে আমাদের মনে সম্মানহানির প্রশ্ন জাগে।
আমাদের সন্তানদেরকে কর্মমুখী বা সৃজনশীল কোনো শিক্ষা দেওয়া হয়নি। তাদেরকে ভাবতে শেখানো হয়নি যে, সৃজনশীলতার একটা মূল্য আছে। আমাদেরকে বুঝতে হবে যে, মানুষ দেখে শেখে; ঠেকে শেখে; শিখে শেখায়। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এখন কর্মমুখী শিক্ষার প্রতি বেশি গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন অর্থাৎ মাঠ পর্যায়ে ব্যবহারিক বিষয়াদি হাতে-কলমে শেখাটা বেশি প্রয়োজন। আর যারা মাঠ পর্যায়ে কাজে দক্ষ তাদেরকে এই কর্মমুখী শিক্ষার প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া উচিত। দেশটা শুধু ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, জজ-ব্যারিস্টার দিয়েই এগিয়ে যাবে না। দেশটা চলেই মধ্যম মানের মানুষের ওপর ভর করে, যারা উদ্যোক্তা হয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়/পেশায় নিজেদেরকে স্বাবলম্বী হিসেবে পরিচিত করেছে। আজকে যারা দেশের বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক তাদের পথ চলাটা শুরুটা হয়েছিল ক্ষুদ্র বা মাঝারি উদ্যোক্তা হিসেবেই।
মূল কথায় আসি, শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমাদের সাধারণ মানুষের ধারণা এই যে, আগের ব্যবস্থার প্রথমটি যতটা কঠিন ছিলো দ্বিতীয়টি ততোটাই সহজ ছিলো। তবে বাস্তবতা হচ্ছে ওই উভয় সময়ে পড়ালেখা করা মানুষদের নেতৃত্বেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাাসহ দেশ পরিচালনা—সবকিছুই চলে আসছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সকলেই পরিবর্তন দেখেছি এবং এই পরিবর্তনের ছোঁয়া সকলেই কম-বেশি পেয়েছি। এই পরিবর্তন যারা করেন এবং যারা পরিবর্তনের নির্দেশ প্রদান করেন উভয়েরই যথাস্থানে বসে দেশের স্বার্থ বিবেচনা করেই কাজটি করা উচিত। শুধু শিক্ষিতের হার বৃদ্ধিতে গুরুত্বারোপ না করে কর্মমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা করে শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞ উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
কর্মমুখী শিক্ষার অভাবে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বেকারত্বের হতাশায় ভুগে শিক্ষার্থীরা নানাবিধ অবৈধ কাজে (চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, অপহরণ, মাদকের ব্যবসা, মাদকের নেশা প্রভৃতি) জড়িয়ে পড়ছে, যা দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং দেশ এগিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে পিছিয়ে যাচ্ছে। শুধু উচ্চতর জীবনের স্বপ্নে শিক্ষার্থীদের বিভোর না করে জীবনের মধ্যম মানের প্রতিও নজর দিতে শেখাতে হবে, স্বপ্নবাজ না হয়ে বাস্তববাদী হতে শেখাতে হবে।
লেখক: যুগ্মপরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক, খুলনা