সম্পাদকীয়
পশ্চিম এশিয়ার অস্থির ভূখণ্ডে গত প্রায় ৪০ দিন ধরে বোমা ও গোলার শব্দে মধ্যপ্রাচ্য তথা গোটা বিশ্ব কাঁপছিল। পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া এই যুদ্ধে ইরান যথাসম্ভব জবাব দিয়েছে। তাদের এই হিম্মতকে বিশ্ববাসীর সাথে আমরাও প্রশংসা করি। যদিও আমরা কেউ যুদ্ধ চাই না।
যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। বাংলাদেশও তার অংশ। কিন্তু আমরা যেকোনো দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। যেকোনো ধরনের আগ্রাসন আমাদের পররাষ্ট্রনীতিরও বিরোধী। যা-ই হোক, যুদ্ধ আপাতত থামায় গোটা দুনিয়ার শান্তিকামী মানুষের মতো আমরাও স্বস্তি অনুভব করছি। যদিও এই স্বস্তি কতদিন স্থায়ী হবে বা আদৌ স্থায়ী হবে কি-না তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট কারণ আছে। কার্যত অর্ধ-উন্মাদ ট্রাম্প ও তার সহচর যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহু বহু ক্ষয়ক্ষতির শিকার হওয়া সত্ত্বেও তাদের ক্ষমতা এখনও ধরে রাখাও অশান্তির আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
আগ্রাসনের প্রায় ৪০ দিনের মাথায় হওয়া যুদ্ধবিরতি বিশ্ববাসীর জন্য প্রশ্বাস ফেরানোর মতো ঘটনা। কারণ এই ব্যাপক আঞ্চলিক যুদ্ধ কেবল ইরান, ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ ছিল না। আত্মরক্ষার স্বার্থে ইরান যুদ্ধকে আঞ্চলিক বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল; যাতে পুরো বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও শরণার্থী সংকটকে চরমে পৌঁছে দেওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সেই অনিশ্চয়তা থেকে সাময়িক মুক্তি পেয়েছি, এটা বাস্তব।
কিন্তু আরও কঠিন সত্য হলো, এই যুদ্ধবিরতি কত দিন স্থায়ী হবে, তা এখনই নিশ্চিত নয়। মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক কৌশল ও কূটনীতির ইতিহাসে আমরা বহুবার দেখেছি, যুদ্ধবিরতি শুধু সৈন্য পুনর্বিন্যাস বা অস্ত্র শাণিত করার সময় দিয়েছেমাত্র। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য, ইরানকে প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তার তেলসম্পদ দখল ও পশ্চিম এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার করা। আর বীরের জাতি ইরান নিজের মর্যাদা ও স্বার্থ রক্ষায় মরণপণ লড়ে যাওয়ার নীতি আঁকড়ে ধরে আছে। ফলে শুধু একটি অস্থায়ী থামা নয়, প্রকৃত শান্তির জন্য প্রয়োজন কূটনৈতিক সুদৃষ্টি, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা এবং সব পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য একটি ভারসাম্যমূলক চুক্তি।
আমরা জানি, যুদ্ধের বীভৎসতা কোনো পক্ষের তাৎক্ষণিক জয় আনলেও আনতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে তা কোনো লাভের ব্যাপার হিসেবে পরিগণিত হয় না। বড় ধরনের যুদ্ধ শুধু রক্তক্ষয়, অবকাঠামো ধ্বংসই করে না গোটা দুনিয়ার জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত করে দেয়। বিশ্বনেতাদের এখন উচিত এই সাময়িক সুযোগকে স্থায়ী শান্তির ভিত্তি বানানোর চেষ্টা করা। কারণ যুদ্ধবিরতি যত দীর্ঘই হোক না কেন, প্রকৃত শান্তি তখনই আসে যখন অস্ত্রের মুখ বন্ধ থাকে এবং কূটনীতির দরজা খোলা থাকে।
আজকের থামা আগামীর শুরু হতে পারে। যদি তা হয় সেই শুরুর নাম যেন হয় শান্তি ও পুনর্গঠন, ধ্বংস নয়।