যশোর, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

গাজা থেকে ইরান

‘বর্বরতা’ যখন রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়

সুজায়েত শামীম সুমন

প্রকাশ : সোমবার, ১৩ এপ্রিল,২০২৬, ১১:০০ এ এম
‘বর্বরতা’ যখন রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই সাম্প্রতিক যুদ্ধোন্মাদনা আসলে কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার এক চরম পরিণতি। গাজায় যে পৈশাচিকতাকে বিশ্ববিবেক নিঃশর্ত ছাড় দিয়ে এসেছে, বর্তমানের এই সংঘাত তারই এক অনিবার্য ও বীভৎস সম্প্রসারণ মাত্র।

আমরা আজ যে অতল গহ্বরের দিকে ধাবিত হচ্ছি, তার মূলে রয়েছে আন্তর্জাতিক আইনের সেই পদ্ধতিগত লঙ্ঘন; যাকে গত আড়াই বছর ধরে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। গাজার ধ্বংসস্তূপকে আজ যে যুদ্ধের নতুন ‘মডেল’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা কেবল একটি অঞ্চলের বিপর্যয় নয়; বরং বিশ্বমানবতার এক চরম নৈতিক পতনের সংকেত।

যখন লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় এক দিনেই ২০০ প্রাণ ঝরে পড়ে, তখন ট্রাম্পের এই হুমকিকে মামুলি ‘আল্টিমেটাম’ ভাবার সুযোগ নেই। প্রকৃত অর্থে আমরা একটা অতল গহ্বরের দিকে দ্রুত বেগে ধাবিত হচ্ছি। তবে তার আগে আমাদের চেনা দরকার এই পতনের শুরুটা ঠিক কোথায় ছিল।

গত মঙ্গলবার ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন লিখলেন, ‘আজ রাতে এক আস্ত সভ্যতা বিলীন হবে, যা আর ফিরবে না,’ ঠিক তার এক বছর আগেই কিন্তু তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন; গাজায় একটি সভ্যতাকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। এই দুই বক্তব্যের পেছনের যোগসূত্রটা ধরতে রকেট সায়েন্স জানার প্রয়োজন নেই। ট্রাম্প খুব ভালো করেই জানতেন ইসরায়েল গাজাকে শ্মশান বানিয়ে ছেড়েছে। এটি আর মানুষের বসবাসের যোগ্য নয়। যখন তিনি ইরানের বিরুদ্ধে এক বেআইনি যুদ্ধে গণহত্যার কুশীলবদের সাথে জোট বাঁধলেন, তখন গাজার সেই রক্তস্নাত ধ্বংসস্তূপই যেন পরবর্তী যুদ্ধের সাকসেসফুল ‘মডেল’ হয়ে ধরা দিলো।

গত আড়াই বছর ধরে পশ্চিমা নীতিনির্ধারক আর নামধারী মেইনস্ট্রিম মিডিয়াগুলো আন্তর্জাতিক আইনের এই পাইকারি লঙ্ঘন বা চিরে ফেলাকে খুব ‘স্বাভাবিক’ এক ডামাডোল হিসেবে পরিবেশন করেছে। গাজা গণহত্যার শুরুতেই যারা সতর্ক করেছিলেন যে, এই দায়মুক্তি একদিন সীমাহীন ভায়োলেন্সের পথ খুলে দেবে, আজ তাদের আশঙ্কাই নির্মম সত্য হয়ে সামনে এলো।

ইরানের বিরুদ্ধে এই প্রক্সি যুদ্ধের সূচনা হলো মিনাব শহরে ১৭৫ জন মানুষকে পুড়িয়ে মারার মধ্য দিয়ে, যার সিংহভাগই ছিল নিষ্পাপ স্কুলছাত্রী। মজার ব্যাপার হলো, সেই অমানবিক এবং নিষ্ঠুরতম ঘটনায় পশ্চিমা সংবাদপত্রের ফ্রন্ট পেজে কোনো ক্ষোভ আসেনি, নেতাদের গলা থেকে বের হয়নি কোনো নিন্দা।

পশ্চিমা চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, গাজায় শিশুদের বিছানায় পুড়িয়ে মারা হয়েছে, কিংবা টার্গেট করে গুলি করা হয়েছে তাদের বিশেষ অঙ্গে। এখন যখন ইরানি স্কুল বা হাসপাতাল ধ্বংসের খবর আসছে, তখন মনে রাখা দরকার; গাজার প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর হাসপাতালে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর সুযোগ তো এই পশ্চিমারাই করে দিয়েছিল।

ট্রাম্প যখন ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুঙ্কার দেন, তখন ইসরায়েলের বিশিষ্ট রাজনীতিক এবং দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োয়াভ গ্যালান্টের সেই কুখ্যাত উক্তির কথা মনে পড়ে, ‘‘সেখানে কোনো খাবার নেই, পানি নেই, বিদ্যুৎ নেই। আমরা লড়াই করছে ‘মানুষরূপী পশুদের’ বিরুদ্ধে।”

ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট যখন গোটা ফিলিস্তিনি জাতিকে ‘অপরাধী’ সাব্যস্ত করেছিলেন, কিংবা তাদের জেনারেল যখন গাজার মানুষকে ‘নরকের স্বাদ’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তখন তো কোনো প্রতিবাদী মিছিল দেখা যায়নি উন্নত বিশ্বে!

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো আন্তর্জাতিক আইনের মৃত্যু। ট্রাম্প আইন মানছেন না সত্যি, কিন্তু সেই আইন তো অনেক আগেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে গেছে; যখন পশ্চিমা মোড়লরা সেই বিচারকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলেন! নিজেদের স্বার্থের কাছে তারা মানবতাকে আগেই বিসর্জন দিয়েছেন।

সম্ভবত তাদের কাছে ফিলিস্তিনি জীবনের দাম কাদা-মাটির চেয়েও কম। না হলে কেন ক্ষুধার্ত মানুষের ওপর গুলি চলা বা বন্দিশালায় যৌন নির্যাতনের খবরগুলো বিশ্বের প্রথম সারির অনেক মিডিয়াকর্মীদের মনে বিন্দুমাত্র দাগ কাটলো না?

এর নেপথ্যে কাজ করেছে চূড়ান্ত ভীরুতা। ক্যারিয়ার ধ্বংসের ভয়, চাকরি হারানোর ভয় কিংবা ‘অ্যান্টিসেমিটিক’ তকমার ভয়। যারা ঝুঁকি নিয়ে সরব হয়েছেন, তাদের ক্যারিয়ার আজ সুতোয় ঝুলছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো; নিজের পজিশন আর ইমেজের জন্য হাজার হাজার ফিলিস্তিনির রক্তের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া কি খুব সম্মানের?

এই ‘সাইলেন্ট প্রুভাল’ বা নীরব সম্মতির মাশুল আজ দিচ্ছে লেবাননের সাধারণ মানুষ। দশ মিনিটে ১০০টি বিমান হামলা চালিয়ে একটি দেশ গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে স্রেফ এই আত্মবিশ্বাসে যে; এর জন্য কাউকে জবাবদিহি করতে হবে না।

যখন বর্বরতা কোনো রাষ্ট্রের অফিসিয়াল পলিসি হয়ে যায় এবং নৃশংসতা হয়ে দাঁড়ায় ডাল-ভাত, তখন সেই সভ্যতার কফিন একদিন না একদিন তৈরি হবেই।

বর্বরতার এই ‘মডেল’ দিয়ে একটি জাতিকে হয়তো ক্ষতবিক্ষত করা যায়, কিন্তু তার আত্মার মুক্তিকে রুদ্ধ করা অসম্ভব। আমেরিকা আর ইসরায়েলের এই রক্তপিপাসু যুদ্ধোন্মাদনা আজ বিশ্ব মুসলিম উম্মাহকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। গাজা থেকে ইরান; প্রান্তভেদে যে রক্তের ধারা আজ মিশে একাকার হয়ে গেছে, তা কেবল শোকের নয়, বরং এক অভূতপূর্ব জাগরণের বারুদ।

এখন আর বিভক্তির বিলাসিতা সাজে না; বরং সময় এসেছে সীমানা ভুলে এক অটুট ও ঐক্যবদ্ধ প্রাচীর গড়ার। মুসলিম বিশ্বের এই সম্মিলিত সংকল্প আর ঈমানি শক্তির সামনে আধুনিক মারণাস্ত্র যে কতটা তুচ্ছ; তার প্রমাণ ইতিহাসে বারবার মিলেছে। যে বিশ্বাসের শক্তিতে মুসলিম সম্প্রদায় বলীয়ান; সেখানে পরাজয়ের কোনো স্থান নেই। পশ্চিমা দম্ভের এই তাসের ঘর ভেঙে পড়তে বাধ্য, যদি মুসলিম বিশ্ব সাহসের শিখাকে প্রজ্জ্বলিত রাখতে পারে এবং মুসলিম বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের দাবানলে একদিন ভস্মীভূত হয়ে যেতে পারে শোষকের প্রাসাদ।

লেখক: বিশ্লেষক

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)