সম্পাদকীয়
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মাত্র আড়াই মাসের মাথায় যশোর সফরে আসছেন, যা নিঃসন্দেহে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ভোটের আগে যশোরে প্রচারণায় এসে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছিলেন তিনি; আজকের সেই সফর যেন তার প্রতিশ্রুতি রক্ষারই নামান্তর। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়ে তিনি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যশোরকে গুরুত্ব দেওয়ায় যশোরবাসী যেমন উচ্ছ্বসিত, তেমনি তাদের প্রত্যাশা এখন আকাশচুম্বী।
প্রধানমন্ত্রীর আজকের সফরসূচি তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক গুরুত্ববহ। উলাসী-যদুনাথপুর খাল পুনঃখননের মাধ্যমে তিনি ‘জিয়া খাল’ হিসেবে পরিচিত এই জলাধারটির প্রতি বিশেষ মমত্ববোধের পরিচয় দিচ্ছেন, যা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের যুগান্তকারী ‘খাল খনন কর্মসূচি’র সূচনাবিন্দু এবং একইসঙ্গে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর জন্য বাবার স্মৃতিবিজড়িত। এদিন তিনি উপমহাদেশের দ্বিতীয় প্রাচীন গণপাঠাগার যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি এবং ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক যশোর ক্লাব পরিদর্শন করবেন- যা ইতিহাসচেতনার প্রতি তার আগ্রহ ও ঐতিহ্যের প্রতি তার আকর্ষণের ইঙ্গিত দেয়।
সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা জেগেছে যশোর সরকারি মেডিকেল কলেজে ৫০০ শয্যার হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে। প্রায় দেড় দশক আগে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হলেও হাসপাতালের অভাবে শিক্ষার্থীরা হাতেকলমে শিক্ষা ও রোগীরা প্রফেসরদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত ছিল। এই উদ্যোগ সে শূন্যতা পূরণ করবে, যা যশোর অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবায় এক যুগান্তকারী অধ্যায় সূচনা করতে পারে।
যশোরবাসীর প্রত্যাশার তালিকা আরও দীর্ঘ। যশোর এয়ারপোর্টকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তর, প্রাচীন পৌরসভাটিকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীতকরণ, যশোর-নড়াইল-পদ্মাসেতু হয়ে ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি, একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও কৃষি ও সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, ফুলের আধুনিক বাজার ও গবেষণা কেন্দ্র, ভৈরবসহ মজে যাওয়া নদ-নদীগুলোর সংস্কার, ভবদহের জলাবদ্ধতা স্থায়ী নিরসন, নওয়াপাড়া শিল্পাঞ্চলের পুনরুজ্জীবন, দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী স্থাপন, সড়ক সম্প্রসারণ ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের আলাদা জোন স্থাপন- এই সব আকাক্সক্ষা উচ্চারিত হচ্ছে যশোরের মানুষের মুখে মুখে। গেল কয়েকদিন ধরে সুবর্ণভূমি যেসব বিশিষ্ট নাগরিকের মুখোমুখি হয়েছে, তারাও জনগণের আকাক্সক্ষার কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন। আজকের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী এসবের কোনো সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেবেন কি না, সেদিকেই তাকিয়ে আছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ।
সরকার গঠনের পর স্বল্পসময়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর যশোর আগমন অত্যন্ত ইতিবাচক ও তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে একটি বার্তা মানুষের মধ্যে যাচ্ছে। আর তা হলো, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক। তবে তিনি আজকের অনুষ্ঠানমালা থেকে যশোরবাসীর জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি দেন বা না দেন, দীর্ঘ অবহেলার শিকার এই অঞ্চলের মানুষকে যে তিনি হৃদয় দিয়ে অনুভব করেন, এটা তারই স্বীকৃতি। ফলে আগামী দিনে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিশ্চয় যশোরকে প্রাধান্য দেওয়া হবে- এই প্রত্যাশা করাই যায়।
প্রধানমন্ত্রীকে যশোরে স্বাগতম। তার এই সফর হয়ে উঠুক এক নতুন বিকাশের সূচনা।