সম্পাদকীয়
বাংলাদেশের জনজীবন এখন বৈশাখের প্রচণ্ড খরায় বিপর্যস্ত। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ যেন পুড়ে যাচ্ছে। তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কোটায় পৌঁছেছে। এই দহনজ্বালার প্রধান কারণ হলো প্রতিবেশী দেশ ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের একতরফা পানি প্রত্যাহার।
গঙ্গার পানি প্রবাহে ভারত যখন নিজেদের স্বার্থে ব্যারাজের মুখ বন্ধ করে দেয়, তখন বাংলাদেশের ভাগ্যে জোটে শুধু শূন্যতা। পানিশূন্যতার এই চরম পরিণতি পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমের বিস্তীর্ণ এলাকাকে ধীরে ধীরে মরুময় করে তুলছে। সেই অঞ্চলেই এখন শীতকালে তাপমাত্রা হয় সবচেয়ে কম, আবার গরমকালে তাপমাত্রা ওঠে সবচেয়ে বেশি। এ এক চরম বৈপরিত্য, যার মূল্য দিতে হচ্ছে কোটি মানুষকে।
ফারাক্কা নিয়ে বাংলাদেশ ভুগছে ১৯৭৪ সাল থেকে। পানিবণ্টনের জন্য দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হয়েছে ঠিকই কিন্তু তা ভারত বারবার লঙ্ঘন করে আসছে। আবার চুক্তি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সালিশি বৈঠকও দেশটি মেনে নিতে প্রস্তুত না। ফল হয়েছে এই যে, ভাটির দেশ নদীমাতৃক বাংলাদেশ মরুময় হয়ে উঠছে, প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানোয় বহু মানুষ পেশা হারাচ্ছে, বাস্তুচ্যুত হচ্ছে খেটেখাওয়া মানুষেরা। নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামছে, ফসলি জমির সেচকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ‘গঙ্গার পানি বণ্টন’ এখন কেবল কূটনৈতিক আলোচনার স্মৃতিচারণা মাত্র, যার কার্যকর প্রতিকার নেই।
এই পরিস্থিতি আর উপেক্ষা করার নয়। আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনায় সমতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। গঙ্গা নদীর পানিবণ্টনে একটি টেকসই ও সময়োপযোগী সমাধান জরুরি। অন্যথায়, আগামী দিনগুলোতে দক্ষিণ-পশ্চিমের এই জনপদ ইতিহাসের এক করুণ নীরব সাক্ষী হয়ে থাকবে শুধু একতরফা স্বার্থের আগুনে পুড়ে।
এখন সময় এসেছে কূটনীতিকে জরুরি ভিত্তিতে সক্রিয় করার। ফারাক্কার বিষবাষ্প থেকে বাঁচতে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক আদালত ও মঞ্চে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। পানির এই অবিচার যদি বন্ধ না হয়, তবে বৈশাখের এই খরা আমাদের ভবিষ্যতের সবুজ সম্ভাবনাকেও পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে।