সম্পাদকীয়
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণা, আজ ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। তার এই বক্তব্য বাস্তবতার চেয়ে আকাক্সক্ষায় ভরপুর বলে মনে হচ্ছে। কারণ শান্তি আলোচনার জন্য ওয়াশিংটনের প্রতিনিধিদল যাচ্ছেন ইসলামাবাদে, অথচ ইরানের অবস্থান এখনও স্পষ্ট নয়। বরং তেহরান জানিয়ে দিয়েছে, বন্দর অবরোধ চলাকালে তারা কোনো অবস্থাতেই আলোচনায় বসবে না; বরং তাদের ‘হাত ট্রিগারে’ বলেও হুমকি দিয়েছে।
এই পরিস্থিতি সুস্পষ্টভাবে দুটি দিক নির্দেশ করছে। প্রথমত, আমেরিকা যে ‘শান্তি’ চাইছে, সেটা হচ্ছে শর্তসাপেক্ষ শান্তি; যেখানে ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাক্সক্ষা সম্পূর্ণ পরিত্যাগের শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে ইরান বলছে, পারমাণবিক কর্মসূচি তাদের অধিকার, যা তারা কোনো অবস্থায় পরিত্যাগ করতে পারে না। এটি তাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও স্বকীয়তার প্রতীক। এখানে আপসের কোনো জায়গা নেই। ফলে চুক্তি আপাতত সম্ভব নয় বলেই মনে হচ্ছে। চুক্তি এমন একটি বিষয়, যা কোনো দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। অথচ আগ্রাসী ট্রাম্প শক্তির জোরে সেই কাজটি করতে চাইছেন; যা ইরানের পক্ষে মেনে নেওয়া সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়ারই নামান্তর।
দ্বিতীয়ত, ট্রাম্পের স্পষ্ট ঘোষণা- চুক্তি স্বাক্ষরিত না হলে তারা ইরানি সভ্যতাকে ধ্বংস করে দেবেন। তিনি দেশটিকে ‘অস্ত্রের মুখে’ চুক্তিতে বাধ্য করতে চাইছেন। কিন্তু ইরান তার স্বাধীন সত্তা ও মর্যাদা বিকিয়ে দিয়ে চুক্তিতে বসতে নারাজ। ইতিহাস সাক্ষী, জবরদস্তির ভিত্তিতে করা কোনো চুক্তি টেকসই হয় না; বরং তা আরও বেশি ক্ষোভ ও সংঘাতের জন্ম দেয়। আর ইরানের মতো দেশ, যাদের রয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, তারা নতজানু হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সব আবদার গ্রহণ করবেন, এটা ভাবার কোনো অবকাশ নেই।
যুদ্ধ বন্ধ ও বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অবশ্যই আলোচনা প্রয়োজন, কিন্তু তা হতে হবে সমান মর্যাদার ভিত্তিতে, হুমকি-ধামকি মাধ্যমে নয়। ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে হলে প্রথমে বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে, পারমাণবিক কর্মসূচিকে ইরানের অধিকার হিসেবে স্বীকার করতে হবে এবং কূটনীতির পথ উন্মোচন করতে হবে। অন্যথা ট্রাম্পের ঘোষিত ‘আজকের শান্তিচুক্তি’ কেবল একটি রাজনৈতিক নাটক হয়েই থাকবে, যার মূল্য চরমে পৌঁছাতে পারে অগ্নিপরীক্ষার মাধ্যমে।
আমরা আশা করি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান- উভয় পক্ষই যেন সংযম ও বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়। কারণ যুদ্ধের চেয়ে শান্তি শ্রেয়, কিন্তু সেই শান্তি যেন হয় স্থায়ী ও ন্যায্য। শান্তি আলোচনা এমন হওয়া উচিত যেখানে কোনো জাতি যেন না ভাবে যে, তার স্বাধীনতা ও মর্যাদার বিনিময়ে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা হচ্ছে।