বেনজীন খান
অর্থনীতির একটি সহজ ও বহুল পরিচিত সূত্র আছে- চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্যের ওপরই নির্ভর করে বাজারদর। সরবরাহ যদি পর্যাপ্ত থাকে, তাহলে বাজারে সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয়; বরং মূল্য স্থিতিশীল থাকার কথা।
কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি তেল পরিস্থিতি এই স্বাভাবিক সমীকরণকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। একদিকে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, দেশে জ্বালানি তেলের রেকর্ড পরিমাণ মজুদ রয়েছে। অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র- পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, তেলের অভাব এবং সাধারণ মানুষের চরম ভোগান্তি।
এই দ্বৈত বাস্তবতা স্বাভাবিকভাবেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। যদি সত্যিই পর্যাপ্ত মজুদ থাকে, তাহলে সরবরাহের এই ঘাটতি কোথা থেকে তৈরি হচ্ছে? এটি কি কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা, নাকি সরবরাহ ব্যবস্থার কোথাও গলদ রয়েছে?
আরও একটি সম্ভাবনা আলোচনায় আসে- বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি। ইতিহাস বলে, অনেক সময় অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী পণ্যের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, যার ফলে দাম বাড়ানো সহজ হয় এবং অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন সম্ভব হয়। যদি জ্বালানি খাতেও এমন কিছু ঘটে থাকে, তাহলে সেটি শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, এটি জনস্বার্থের বিরুদ্ধে একটি গুরুতর আঘাত।
তবে এখানে একটি সংবেদনশীল প্রশ্নও উঠে আসে- এই ধরনের সিন্ডিকেট বা অসাধু চক্র যদি থেকে থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা কতটা নেওয়া হচ্ছে? জনগণের দৃষ্টিতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে: সমস্যার মূল উৎস চিহ্নিত ও প্রতিকার করার চেয়ে মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তগুলোই যেন বেশি দৃশ্যমান। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। সরকারের পক্ষ থেকে সরবরাহ, মজুদ এবং বিতরণ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরবরাহ চেইনের প্রতিটি স্তরে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। যদি কোথাও অনিয়ম বা কারসাজির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অপরিহার্য।
কারণ জ্বালানি তেল শুধু একটি পণ্য নয়; এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এই খাতে অস্থিরতা মানে পরিবহন, উৎপাদন এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব পড়া। আর তার চেয়েও বড় কথা, এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে বিশ্বাসের সম্পর্ককে প্রভাবিত করে।
অতএব, জ্বালানি তেলের বর্তমান সংকটকে শুধুমাত্র সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি বৃহত্তর প্রশ্নের ইঙ্গিত দিচ্ছে- আমাদের বাজার ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর, এবং রাষ্ট্রীয় তদারকি কতটা নির্ভরযোগ্য।
এই প্রশ্নগুলোর সৎ ও কার্যকর উত্তরই নির্ধারণ করবে সংকটটি সাময়িক, নাকি কাঠামোগত।
২০ এপ্রিল ২০২৬
লেখক: অ্যাক্টিভিস্ট, সংগঠক, লেখক
*মতামত লেখকের নিজস্ব