সম্পাদকীয়
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য যোগ দেওয়ার পর প্রথম মতবিনিময় সভায় চরম হট্টগোল হয়েছে। একপর্যায়ে উপাচার্য অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগেই বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন।
অনুষ্ঠানের বিতর্কের মূল বিষয় ছিল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি করা যাবে কি যাবে না। একদল শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। অন্যপক্ষে অবস্থান নেন সরকারি দলের ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল; যারা কিছুদিন আগে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি শুরু করেছে। উভয় পক্ষ অনড় থাকায় সভায় উত্তেজনা দেখা দেয়।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ। এই আইনের পক্ষে-বিপক্ষে বেশকিছু যুক্তি আছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন সরকারি দলের ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে রাজনীতি করেছে। সেসময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোমরে এতো জোর ছিল না যে, তারা সংগঠনটির কার্যক্রমে বাধা দেয়। ক্ষমতার প্রভাবে ছাত্রলীগ সেসময় প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য কোনো ছাত্রসংগঠনকে ক্রিয়াশীল হতে দেয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর একচেটিয়া কর্তৃত্ব বজার রাখার ফ্যাসিবাদী মানসিকতা তারা পুরোমাত্রায় ধারণ ও প্রয়োগ করতো। একপক্ষীয় সংগঠন হলে ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, এখানেও তা-ই হয়েছিল। এমনকি নিজ সংগঠনের কর্মীও খুন হয়েছিলেন ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে পরিচিত দুর্বৃত্তদের হাতে।
ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর ছাত্রলীগ এখন নিষিদ্ধ সংগঠন। এই অবস্থায় বর্তমান সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারের মোক্ষম সুযোগ পেয়েছে এবং তা তারা কাজে লাগাতে চাইছে।
আমাদের এই ভূমিতে ছাত্ররাজনীতির রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনে ছাত্রসংগঠনগুলোর অবদান ছিল অসামান্য। আবার আমরা এটাও দেখেছি, প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রসংগঠনের দীর্ঘ লড়াই অথবা সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ঝরে গেছে অনেক সম্ভাবনাময় প্রাণ। ছাত্ররাজনীতির এই নেতিবাচক দিকের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশন জট একসময় গুরুতর আকার নিয়েছিল। এসব কারণে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্ররাজনীতির বিষয়ে তীব্র নেতিবাচক মনোভাব গড়ে ওঠে। যদিও সেই ‘রাজনীতিবিমুখ’ শিক্ষার্থীরাই শেখ হাসিনার অপশাসন দূর করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন।
এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে নবসৃষ্ট ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশতে ছাত্ররাজনীতি করার অধিকার রদ করা হয়। তবে ট্রাজেডি হলো, এই আইন বা আদেশের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া উপেক্ষিত হয়, কিন্তু শিক্ষকরা দলীয় রাজনীতির ভাবধারায় পৃথক পৃথক সংগঠন করে ঠিকই চুটিয়ে রাজনীতি করে যান এবং তার সুবাদে প্রশাসনিক দায়িত্বসহ সরকারি অন্যান্য সুবিধাদি হাতিয়ে নেন।
অন্যদিকে, কোনো ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলে তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে গোপনে কাজ করতে অভ্যস্ত ছাত্রসংগঠনগুলো। তারা নানা নামে স্বেচ্ছাসেবামূলক সংগঠন খুলে তার আড়ালে নিজেদের রাজনৈতিক কাজ সুচারুরূপে সম্পন্ন করে। ভয়ের ব্যাপার হলো, গোপনে এভাবে কার্যক্রম পরিচালনায় অভ্যস্ত ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রায় সবই উগ্র ডানপন্থি, জিহাদি বা ধর্মভিত্তিক কট্টর ভাবাদর্শের। তাদের উত্থান এই দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় ফেলে সচেতন নাগরিকদের। একবিংশ শতাব্দীতে এসে পশ্চাৎপদ রাজনীতির উত্থান শেষাবধি দেশকেই অন্ধকারে নিমজ্জিত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
সবমিলিয়ে শিক্ষার্থীদেরই বিবেচনায় নিতে হবে তারা কোন দিকে এগুলে দেশের সার্বিক মঙ্গল নিশ্চিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সমাজের অগ্রসর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে তারা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেবেন বলে প্রত্যাশা করি।