যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি: আলোচনা-সমালোচনা হোক যৌক্তিক

এজাজ উদ্দিন টিপু

প্রকাশ : সোমবার, ২০ এপ্রিল,২০২৬, ১২:০০ পিএম
আপডেট : সোমবার, ২০ এপ্রিল,২০২৬, ১২:২৮ এ এম
জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি: আলোচনা-সমালোচনা হোক যৌক্তিক

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একতরফা যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার পর এক মাস ২০ দিন পার হয়েছে। ইরান শুধুই যে মার খেয়েছে, ব্যাপারটা তা নয়। বরং তারা সাধ্যমতো জবাব দিয়েছে। এই জবাবদানের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের যতগুলো সামরিক ঘাঁটি আছে, তার কোনোটিই ইরানি আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়নি। ফলে যুদ্ধ শুধু ইরানের মাটিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ছড়িয়ে পড়েছে পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর, আরব সাগর থেকে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমনা, ইয়েমেন এমনকি লেবানন পর্যন্ত।

বড় মাপের আঞ্চলিক যুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী ফল সারা দুনিয়ায় পড়ে। তার মধ্যেও এই যুদ্ধটির প্রভাব তুলনামূলক বেশি। এর প্রধান কারণ হলো, যুদ্ধাবস্থায় থাকা দেশগুলো পৃথিবীর প্রায় ৭০ শতাংশ তেল উৎপাদন ও বিপণন করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরানি তেল স্থাপনাগুলোকে টার্গেট করে হামলা চালাতে থাকে। এর অবশ্যম্ভাবী পরিণাম হিসেবে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের কথিত মিত্রদের তেলক্ষেত্র ও স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানে। একপর্যায়ে তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, যে সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্বের ২০ থেকে ২২ শতাংশ তেল পরিবহন হয়। যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগকারী জাহাজ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা আরোপ করে। পরবর্তীতে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও যুক্তরাষ্ট্র এখনও সেই পথে হাঁটেনি।

যুদ্ধরত দেশগুলোর এই আগ্রাসী নীতি যে পণ্যের বাণিজের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে তা হলো জ¦ালানি তেল, গ্যাস। যুদ্ধ শুরুর দিন থেকে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের বাজার ভীষণ অস্থির হয়ে ওঠে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল যেখানে ৭০ ডলারের নীচে বিক্রি হচ্ছিল, লাফিয়ে লাফিয়ে তা বেড়ে ১২০-১৩০ ডলারে দাঁড়ায়। শুধু উৎপাদন ব্যাহত হওয়াই এর পেছনের একমাত্র কারণ নয়, বরং পরিবহন দুরুহ হয়ে ওঠাও গুরুত্বপূর্ণ কারণ। যুদ্ধাবস্থায় তেলের ট্যাংকারের যাতায়াত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে জাহাজের বিমা খরচও বেড়ে যায় অস্বাভাবিক মাত্রায়। আবার, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র পর্যায়ক্রমে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ ঘোষণা করায় জাহাজ চলাচল নজিরবিহীনভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফল দাঁড়ায় সারা দুনিয়ার তেলবাজারে অস্থিরতা, একইসঙ্গে শেয়ারবাজারের ভয়াবহ পতন; যা সামগ্রীক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মেরুদণ্ডে আঘাত করে।

পরিপূর্ণভাবে মুক্তবাজার অর্থনীতির মডেল অনুসরণকারী দেশগুলোতে সরকার পণ্যের দাম নির্ধারণ করে না। তা নির্ভর করে পণ্যের যোগান ও চাহিদার ওপর। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র, যারা এই যুদ্ধের প্রধান পক্ষ, তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারেও জ্বালানিপণ্যের দাম হুহু করে বাড়তে থাকে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র তেল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাহলে আমাদের মতো দেশ, যারা জ¦ালানি তেলের চাহিদার পুরোটাই আমদানিনির্ভর, তাদের অবস্থা কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।

আর যেসব দেশ মুক্তবাজার অর্থনীতির মডেল আংশিক ফলো করে, তারা পরিস্থিতি সামাল দিতে নানা ধরনের ব্যবস্থা নেয়। যেমন মালয়েশিয়া তার নাগরিকদের মাসে জ¦ালানি তেল সংগ্রহের ওপর সিলিং নির্ধারণ করে দিয়েছে। কোনো কোনো দেশ বাসাবাড়ি থেকে অফিস ও শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনার মতো ব্যবস্থা নিয়েছে। আবার কোনো কোনো দেশ অফিস সময় কমিয়েছে, বাড়তি জ্বালানি ব্যবহার অপরিহার্য নয়, এমন ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

বাংলাদেশ সরকারও যুদ্ধ শুরুর পরপরই জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়। তার মধ্যে অফিসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার হ্রাস, আলোকসজ্জা পরিহার, জ¦ালানি সংগ্রহে সিলিং (যদিও তা স্বল্পস্থায়ী ছিল) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এই দেশের মানুষ সরকারি নির্দেশনা মানতে খুব কম আগ্রহী। প্রশাসনযন্ত্রও এতোটা শক্তিশালী না যে, নির্দেশনা পাওয়ামাত্র তা শতভাগ বাস্তবায়ন করতে পারবে।

ফলস্বরূপ এই দেশে জ্বালানি নিয়ে অরাজকতা প্রথম থেকেই শুরু হয়। ফিলিং স্টেশনগুলোতে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে তেল সংগ্রহের উদ্দেশে। পরিস্থিতিগত কারণে কোথাও কোথাও গুরুতর অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে। সরকার বাধ্য হয়ে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করে, মোতায়েন করা হয় পুলিশ। তাতেও পরিস্থিতির ইতরবিশেষ হয়েছে, তেমনটি বলা যাচ্ছে না।

গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালে পৃথিবীর শতাধিক দেশে তেলের দাম বেড়েছে। কোনো কোনো দেশে দাম প্রায় দ্বিগুণও হয়েছে। বাংলাদেশ যুদ্ধের প্রায় ৫০ দিনের মাথায় জ¦ালানির মূল্য বাড়ানোর ঘোষণা দিলো। এই ৫০ দিনে সরকারকে উচ্চমূল্যে তেল আমদানি করতে হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা সংকট ও ট্যাংকারের চলাচল নির্বিঘ্ন না হওয়ায় বাধ্য হয়ে সিঙ্গাপুরের স্পট মার্কেট থেকে বাড়তি দামে তেল কিনতে হয়েছে।

২০২৪ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশে জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু করে তৎকালীন সরকার। স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি হলো, বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য পর্যবেক্ষণ করে সেই অনুযায়ী প্রতি মাসের প্রথম দিন ৩০ দিনের জন্য তেলের মূল্য সমন্বয় করা। এই পদ্ধতিতে প্রতি মাসের শেষ দিন সংশ্লিষ্ট কমিটি বৈঠকে বসে এবং রাতেই ঘোষণা দিয়ে দেয় যে, আগামী মাসে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিনের মূল্য এতো টাকা হবে।

২০২৪ সালের মার্চের পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পরই প্রথম সরকার সেই নিয়ম ভঙ্গ করে জ্বালানির মূল্য অপরিবর্তিত রাখে। তা না হলে বাংলাদেশে এতোদিন তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠতো। কথা হলো, সরকার যে ৫০ দিন জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল রাখলো, এটা কীভাবে সম্ভব হয়েছে? আর কেনইবা এখন দাম বাড়ানো হলো।

সরকারের প্রধানমন্ত্রী, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন, জনসাধারণের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সরকার জ্বালানি তেলের ওপর বিপুল ভর্তুকি দিচ্ছে। তারা এই ভর্তুকির অংকও জানিয়েছেন বিভিন্ন সময়।

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। এর অর্থনীতির আকার ছোট। সরকার স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তাসহ নানা খাতে এমনিতেই বিপুল টাকা ভর্তুকি দেয়। তার ওপর জ্বালানি খাতে হঠাৎ এই বিপুল টাকা ভর্তুকি অর্থনীতির ওপর সাংঘাতিক চাপ বাড়ায়, এতে কারও কোনো সন্দেহ নেই। এই বিপুল টাকা তাই অনির্দিষ্টকাল ভর্তুকি দেওয়ার সামর্থ সরকারের নেই। এতে অত্যাবশ্যকীয় অন্যান্য খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে; শেষ বিচারে যা জনগণের কাঁধেই চাপবে।

দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসন ও পরে প্রায় দেড় বছরের অনির্বাচিত সরকারের পর বাংলাদেশ একটি বহুলকাঙ্ক্ষিত নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। কিন্তু সেই সরকারের দুর্ভাগ্য হলো, লুটপাটের মাধ্যমে ফোকলা হয়ে যাওয়া একটি অর্থনীতি নিয়ে তাদের যাত্রা শুরু করতে হয়েছে। আবার যাত্রা শুরুর পরপরই সম্পূর্ণ অনাকাক্সিক্ষতভাবে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে; যে যুদ্ধের দূরতম দায়ও বাংলাদেশের নেই। এমন পরিস্থিতিতে আমরা প্রথমত সরকারকে সাধুবাদ জানাবো এই কারণে যে, তারা যতদিন সম্ভব তেলের দর অপরিবর্তিত রেখেছিল। দ্বিতীয়ত, অর্থনীতি বাঁচাতে গিয়ে একান্ত বাধ্য হয়ে যখন জ¦ালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে, সেটাও অন্যান্য দেশের তুলনায় কম।

সরকারের নানা নীতিগত বিষয়ে নাগরিকদের সমালোচনা থাকবে। সমালোচনা জারি রাখা সরকারকে সঠিক পথে পরিচালিত হতে সহায়তা করে। কিন্তু আমাদের সমাজে এক ধরনের প্রবণতা আছে যে, সরকার যা-ই করুক, তার সমালোচনা করতেই হবে। এটা কোনো সুস্থ মানসিকতার পরিচায়ক নয়। বাস্তব অবস্থা বুঝে সমালোচনা করা দরকার। অযৌক্তিক সমালোচনা করে সরকারকে হয়তো বেকায়দায় ফেলা যায়, বিরোধী পক্ষে লোক ভেড়ানো যায়, কিন্তু তাতে আখেরে দেশের কোনো মঙ্গল হয় না। মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশ জ্বালানি তেল আমদানিনির্ভর একটি দেশ। তেলের দাম কখন কতটুকু বাড়বে বা কমবে, তার নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে নেই। বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থিতিশীল হয়ে উঠলে কোনো দেশ ভর্তুকি দিয়ে কিছুদিন দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে বটে, কিন্তু তা কোনো মতেই অনির্দিষ্টকাল নয়। যে সমস্যা বাংলাদেশ সৃষ্টি করেনি, আমরা তার দায় এদেশের সরকারকে দিতে পারি না। তবে হ্যাঁ, জ¦ালানি সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থায় ত্রুটি নিয়ে থাকলে তা নিয়ে অবশ্যই আমরা সমালোচনামুখর হবো। এটাই হবে প্রতিটি সচেতন নাগরিকের সুবিবেচনাপ্রসূত কাজ।

লেখক: যুগ্ম-সম্পাদক, যশোর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)