সম্পাদকীয়
যশোর জেলায় অনুমোদিত ৩০৯টি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে ২৭৩টির লাইসেন্স হালনাগাদ নেই- এ তথ্য স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিদ্যমান ভয়াবহ অরাজকতার এক চরম উদাহরণ। এর মানে হলো, এই জেলায় মাত্র ৩৬টি প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনে চলছে, বাকিগুলো কার্যত আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে। নানা মহলের যোগসাজশে গড়ে ওঠা এক সুপরিকল্পিত অনিয়মের শৃঙ্খল যেন এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটি।
বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ। আইন অনুযায়ী যেখানে প্রশিক্ষিত নার্স ও জনবল থাকা বাধ্যতামূলক, সেখানে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেই তা নেই। জীবাণুমুক্ত পরিবেশ তো দূরের কথা, অস্ত্রোপচার কক্ষগুলোতে পর্যাপ্ত সরঞ্জাম বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব প্রকট। আরও ভয়াবহ হলো, অস্ত্রোপচারের অনুমতিপ্রাপ্ত নন- এমন চিকিৎসক, এমনকি অচিকিৎসকরাও ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশন করছেন। ফলে রোগীমৃত্যু নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ, অবহেলা ও অপরিচ্ছন্নতার মতো নানা সংকট রয়েছে। এই সংকটকে পুঁজি করে বেসরকারি পুঁজিপতিরা সেবার নামে তঞ্চকতার ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন। উচ্চমূল্যে সেবা বিক্রি, নিয়মকানুন উপেক্ষা করে মানুষের প্রাণ নিয়ে খেলা- এ যেন তাদের কাছে ডালভাত।
প্রশ্ন হচ্ছে, যেখানে স্বাস্থ্য প্রশাসনসহ একাধিক নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ রয়েছে, সেখানে কীভাবে এমন অনিয়ম চলতে পারে? রোগীমৃত্যু বা বড় ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে তারা কিছুদিন তৎপর থাকেন, কিন্তু তারপর আবার সেই একই চিত্র। অভিযোগ রয়েছে, কর্তৃপক্ষকে নানাভাবে তুষ্ট করে এই প্রাণঘাতী বাণিজ্য চালানো সম্ভব হয়।
এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। লাইসেন্সবিহীন সব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। লাইসেন্স হালনাগাদ না করা ২৭৩টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কেন এখনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? নিয়মিত ও আকস্মিক তদন্ত জোরদার করুন। অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ও তদবিরকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। অচিকিৎসকের অস্ত্রোপচার ও অননুমোদিত চিকিৎসাসেবা দেওয়াকে কঠিন শাস্তির বেড়াজালে বাঁধতে হবে।
জনস্বাস্থ্য নিয়ে কারও দোকানদারি চলবে না। মানুষের জীবন কারও খেলার পুতুল নয়। এখনই আইনের কঠোর প্রয়োগের সময়, নইলে দিনদিন এই অনিয়ম প্রসারিত হবে মাত্র।