সম্পাদকীয়
সারা দেশে বর্ণাঢ্য আয়োজনে বাংলা নববর্ষবরণ করা হয়েছে। এটা আনন্দের ব্যাপার এই কারণে যে, ৯৮-৯৯ শতাংশ বাঙালি অধ্যুষিত এই দেশে মোটা দাগে সর্বজনীন উৎসব মূলত বাংলা বর্ষবরণই। এটি মূলত একদিনের উৎসব। এর আগের দিন অর্থাৎ বাংলা বছরের শেষ দিনে চৈত্র সংক্রান্তি উদযাপিত হয়। তবে চৈত্র সংক্রান্তিতে ধর্মের যোগ থাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠী এই উৎসব থেকে বিচ্যুত থাকে।
পক্ষান্তরে নববর্ষের উৎসবে ধর্মবর্ণনির্বিশেষে বাঙাালিরা অংশগ্রহণ করেন। তবে এই উৎসব নিয়েও বিতর্ক আছে দুই দিক থেকে।
প্রথমত, এটি বাংলা নববর্ষ হলেও এর গোড়াপত্তন হয় একজন অবাঙালির হাতে। তিনি তখনকার মুঘল সম্রাট আকবর। এই সামন্ত প্রভু বাংলা বর্ষ গণনা পদ্ধতি চালু করেছিলেন আসলে ‘ফসলি সন’ হিসেবে। তখনকার ভারতের একটি অংশ বাংলায় ফসল ফলতো বছরে দু’বার। সেই হিসেব করে তিনি ফসল ওঠার সময় প্রজার কাছ থেকে খাজনা আদায় সহজ হবে বিধায় বৈশাখকে বছরের প্রথম মাস গণ্য করে বাংলা বর্ষ গণনা চালু করেন।
সম্রাট আকবরের সময় আধুনিক কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা ছিল না। ফলে বিস্তীর্ণ জমি থাকা সত্ত্বেও মানুষের খাদ্যাভাব ছিল। এছাড়া বন্যা, খরা, পোকার আক্রমণ লেগেই থাকতো। কিন্তু কৃষিভিত্তিক এই সভ্যতার মূল উৎপাদক খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য থাকতেন। খাজনা দিতে ব্যর্থ হলে তার জমিজিরাত অপহৃত হতো, কখনো কখনো কৃষককে কয়েদ করা হতো। শারীরিক নির্যাতন তো ছিল মামুলি ব্যাপার।
তো, এই খাজনা আদায়ের দিনটি কেন উৎসব হবে, যেদিনটি মূলত কৃষকপ্রজার সম্ভাব্য কষ্টের দিন? এখানে সামন্তপ্রভুর কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হয়। যেদিন সম্রাটের পেয়াদারা খাজনা আদায় করতেন, সেদিন প্রজাদের জন্যও তারা মিষ্টিমুখের ব্যবস্থা রাখতেন। মূলত সেখান থেকেই পয়লা বৈশাখে মিষ্টিমুখের প্রচলন, যা আজও কম-বেশি বহমান। যদিও আজ বাংলার জমিন মূলত তিন ফসলি। ফলে ফসল উৎপাদনের মওসুমও পরিবর্তিত হয়েছে। বৈশাখের প্রথম দিন এখন ফসল ওঠার দিন নয়।
একথা ঠিক যে, পৃথিবীর দেশে দেশে নতুন বছর সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়। আমাদের দেশেও তা উদযাপিত হলে দোষের কিছু নেই। কিন্তু এই বর্ষবরণের অনুষ্ঠানের সঙ্গে লেপ্টে আছে আমাদের পূর্বপুরুষ কৃষকের চোখের জল- একথা যেন আমরা ভুলে না যাই।
দ্বিতীয়ত, গেল শতাব্দীর আশির দশকে বর্ষবরণের এই গ্রামীণ আয়োজন নগরে আনা হয়। পয়লা বৈশাখের প্রত্যুষে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা প্রথম বের হয় বাংলাদেশের যশোর শহরে। চারুপীঠ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন এই আয়োজন করে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট যশোরের আদলে প্রথম রাজধানীতে বৈশাখি শোভাযাত্রা বের করে। এরপর তা ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে।
পয়লা বৈশাখের এই আয়োজনে যে ধরনের অনুষ্ঠান রাখা হয়, তা আমাদের দেশের কট্টর ইসলামপন্থিদের পছন্দ নয়। তারা এটিকে ‘হিন্দুয়ানি আচার’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে আসছেন। এর পেছনে সঙ্গত কিছু কারণ আছে। তবে ঢালাওভাবে এই অনুষ্ঠানকে ‘হিন্দুয়ানি’ বলা যায় কি-না, তা নিয়ে বিতর্ক জারি আছে সমাজে।
আমরা মনে করি, একটি আধুনিক সমাজে যেকোনো বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক থাকতেই পারে এবং তা থাকাটাই সমাজ বিকাশের পূর্বশর্ত। মনে রাখা দরকার, বিতর্ক থাকার কারণে পয়লা বৈশাখের আয়োজন থেকে ইলিশ মাছ নিষ্ক্রান্ত হয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কারণ পয়লা বৈশাখের সাথে দৃশ্যত ইলিশের কোনো সম্পর্ক নেই। কিছু সাংস্কৃতিক কর্মী উৎসবে পান্তা-ইলিশের প্রচলন করেন এবং তা অপেক্ষাকৃত সচ্ছল শহুরে মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত শ্রেণি সানন্দে লুফে নেন।
আবার নববর্ষের শোভাযাত্রার নাম কয়েক দফা বদলে এখন ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ হয়েছে; যা অধিকাংশ মানুষ গ্রহণ করেছেন বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত জন্তু-জানোয়ারের মুখোশ এবং অন্যান্য কিছু উপকরণ নিয়ে যে বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরে চলছে, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও তা আমলে নিয়ে ধীরে ধীরে পরিবর্তনের দিকে এগুচ্ছে বলে মনে করার সঙ্গত কারণ আছে। এছাড়া এই দিনের উৎসবে মাটির সানকিতে খাদ্যগ্রহণের যে রেওয়াজ চালু করা হয়, তা-ও ক্রমশ বিলুপ্তির পথে। অনেকের মতে, ৩৬৪ দিন সিরামিক বা অন্য কোনো পাত্রে খাদ্যগ্রহণ করা মানুষ একদিন মাটির সানকিতে খেলেই তিনি বাঙালি হয়ে যান- এটা নিতান্তই হাস্যকর চিন্তা। বিপরীতে কোনো কোনো সংগঠক বলেন, একদিন হলেও আমরা শেকড়ের কথা জানান দিতে চাই, যাতে মানুষ তার অতীত ভুলে না যায়। নিশ্চয় এই বিতর্কেরও পরিসমাপ্তি ঘটবে একদিন।
ক্রমাগত পরিবর্তন ও বোঝাপড়ার মধ্যদিয়ে বর্ষবরণ উৎসব একসময় পরিশীলিত হবে- এমন প্রত্যাশা করাই যায়। উৎসবের সূচনা যেভাবেই হোক না কেন, একটি জাতি যদি তা আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়, তাহলে তার বিরোধিতা করা সমীচীন হবে না। এমনিতেই বাঙালির জীবন নানা নিষেধের বেড়াজালে আবদ্ধ। আমাদের তো সর্বজনীন উৎসবের (পাহাড়ি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তার কিছু মানুষ বাদে) উপলক্ষ নেই। থাক না একদিনের একটি চিত্তাকর্ষক আয়োজন! প্রয়োজনে তা আরও বিস্তৃত ও বিকশিত হোক। অনেক বেশি শুদ্ধতা-অশুদ্ধতার নিক্তিতে সবকিছু না-ইবা মাপলাম।