সম্পাদকীয়
পদ্মাসেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই সেতু ও রেলসংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ায় ঢাকা থেকে যশোর, খুলনা ও বেনাপোলের দূরত্ব যেন মুহূর্তেই কমে গিয়েছিল। কিন্তু দক্ষিণ-পশ্চিমের মানুষে এই সেতুর পরিপূর্ণ সুফল আজও ভোগ করতে পারেনি। বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে রেলওয়ের অনীহা ও প্রাসঙ্গিক কিছু সমস্যা।
সেতু উদ্বোধন ও রেলসংযোগ প্রকল্প শেষ হওয়ার পর যশোর-নড়াইল-পদ্মাসেতু-ঢাকা পথে দিনে মাত্র একটি যাত্রীবাহী ট্রেন চালু করা হয়; যা এখনও বহাল রয়েছে। তাও সেই ট্রেনটি যশোর ছাড়ে দুপুরের পর, ফলে যাত্রীদের ঢাকা পৌঁছাতে সন্ধ্যা গড়িয়ে যায়। ফলে ঢাকায় প্রয়োজনীয় কাজ সেরে দিনের দিন যশোরে ফিরে আসার আকাক্সক্ষা অধরাই থেকে গেছে। নাগরিকদের দাবি, এই রুটে দিনে অন্তত দুটি ট্রেন চালু করতে হবে, যাতে সময়ানুযায়ী যাতায়াত সম্ভব হয়। তারা এই দাবি আদায়ের লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন। গেল মঙ্গলবার নাগরিকদের প্লাটফরম যশোর জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন। আগামী ২৭ এপ্রিল যশোর সফরে আসছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, স্মারকলিপি দিয়ে নাগরিকরা মূলত এই জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছেন।
নাগরিকদের এই দাবি সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও সময়োপযোগী। পদ্মাসেতু চালু হওয়ার মূল লক্ষ্যই ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী করা। কিন্তু যশোরসহ দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ জনপদগুলোর সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ আজও কার্যত সড়ককেন্দ্রিক। অথচ সড়কপথের চেয়ে রেলপথ অধিক আরামদায়ক, নিরাপদ এবং সময় ও ব্যয়সাশ্রয়ী।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, পর্যাপ্ত লোকোমোটিভ ও কোচ অভাবে এই রুটে ট্রেন সংখ্যা বাড়ানো যাচ্ছে না। তারা জানিয়েছেন, বিদেশ থেকে ইঞ্জিন ও বগি আমদানি হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু এই যুক্তি বছরের পর বছর চলতে পারে না। পদ্মাসেতু রেলসংযোগ প্রকল্প চালুর পর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমের মানুষ বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছ থেকে একই কথা শুনে আসছেন। লোকোমোটিভ ও কোচ আমদানি করতে আর কত সময়ের প্রয়োজন?
অন্যদিকে, তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ ও অলাভজনক রুটেও বাংলাদেশ রেলওয়ের একাধিক ট্রেন চলাচল করে। সেক্ষেত্রে অত্যন্ত লাভজনক ও গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-যশোর-বেনাপোল রুটে কেন বাড়তি ট্রেন চালু করা যাবে না, তা আমাদের বোধগম্য নয়। পদ্মাসেতুতে বিনিয়োগের পর এর পূর্ণ সুফল নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক নমনীয়তা ও দূরদর্শিতার কোনো বিকল্প নেই। তাছাড়া বিপুল ব্যয়সাপেক্ষ এই সেতু ও রেলসংযোগ প্রকল্পের পূর্ণ ব্যবহার ছাড়া খরচের টাকা উঠবে কীভাবে?
সেই কারণে যশোরের নাগরিক সমাজের সাথে সংহতি প্রকাশ করতে আমরা দাবি জানাতে চাই, ঢাকা-যশোর-বেনাপোল রুটে সকাল ও সন্ধ্যায় অন্তত দুটি যাত্রীবাহী ট্রেন চালু করার ব্যবস্থা করতে হবে যেকোনো মূল্যে। যাত্রী চাহিদার ভিত্তিতে ট্রেনের সময়সূচি এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যেন যাত্রীরা ঢাকা গিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে দিনের মধ্যেই নিজ বাসস্থানে ফিরতে পারেন। লোকোমোটিভ ও কোচ স্বল্পতা দূর না হওয়া পর্যন্ত অলাভজনক ও অজনপ্রিয় রুট থেকে সার্ভিস সরিয়ে এনে ঢাকা-পদ্মাসেতু-নড়াইল-যশোর-বেনাপোল রুটে বাড়তি ট্রেন যোগ করতে হবে। ভবিষ্যতে এই রুটকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রেল যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দাঁড় করাতে হবে।
পদ্মাসেতুর মতো একটি বৃহৎ প্রকল্পের পরিপূর্ণ সুবিধা জনগণ ভোগ করতে না পারে তা হবে নিতান্তই হতাশার। শুধু তা-ই নয়, প্রকল্পের জন্য লুটপাট যা হওয়ার হয়ে গেছে, হয়তো লুটপাটকারীদের বিচারের মুখোমুখিও আমরা দেখতে পাবো। কিন্তু তাতে জনগণের প্রত্যক্ষ সুবিধা অর্জনের কিছু নেই।
আমরা প্রত্যাশা করি, প্রধানমন্ত্রী যশোর সফরকালে জনস্বার্থে এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবেন।