চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি
ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রত্যক্ষ ফল পড়ছে চাষাবাদের ওপর। চলতি বোরো মওসুমে চুয়াডাঙ্গার চাষিদের বিঘাপ্রতি ধান উৎপাদন খরচ দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে বলে জানাচ্ছেন কৃষকরা।
মাঠের ফসল উৎপাদনে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জ্বালানির দাম এক ধাক্কায় ১৪ টাকা বাড়ায় নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। লিটারপ্রতি ডিজেলের দর বৃদ্ধির হারে ফসলের মাঠে বিঘাপ্রতি ধান উৎপাদন খরচ দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। বিশেষ করে বোরো মৌসুমের শেষ সময়ে, যখন সেচ, ধান কাটা ও মাড়াইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সামনে- ঠিক তখনই উৎপাদন ব্যয়ের নতুন হিসাব কষতে হচ্ছে তাদের।
দেখা গেছে, চুয়াডাঙ্গার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন পেকে ওঠা বোরো ধানের সোনালি আভা। দূর থেকে দেখলে মনে হবে কৃষকের মুখেও নিশ্চয়ই হাসি ফুটেছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
টানা কয়েক মাসের শ্রম, সার, বীজ, কীটনাশক আর সেচ ব্যয়ের পর ফসল ঘরে তোলার সময় এসে কৃষক পড়েছে নতুন সংকটে। জ্বালানি সংকটের সঙ্গে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তাদের লাভের সম্ভাবনাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
দামুড়হুদা উপজেলার ইব্রাহিমপুর গ্রামের বোরোচাষি শফিউল আলম বলেন, ধান কাটার আগে এখনও কয়েক দফা সেচ দিতে হবে। এই সময় জমিতে পর্যাপ্ত পানি না পেলে ধানের শীষে চিটে ধরার আশঙ্কা থাকে, ফলে ফলন কমে যায়।
তাই বাধ্য হয়েই বাড়তি খরচে সেচ চালাতে হচ্ছে। আগে যেখানে বিঘাপ্রতি জমিতে সেচের জন্য জ্বালানি ব্যয় ছিল তুলনামূলক কম, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকার ঘরে।
আরেক কৃষক আব্দুর রব বলেন, শুধু মূল্যবৃদ্ধিই নয়, অনেক এলাকায় ডিজেল সংগ্রহ করাও হয়ে উঠেছে কঠিন। তেলপাম্পে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছেন না অনেকে। এতে নির্ধারিত সময়ে সেচ দেওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয়ভাবে খুচরা দোকানে ১৬০-১৭০ টাকা লিটারে ডিজেল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
কৃষক হাসান আলী জানান, একটি মৌসুমে ফসল ফলাতে তাদের ধারদেনা করতে হয়। ব্যাংক ঋণ, এনজিও ঋণ কিংবা ব্যক্তিগত ধার নিয়ে আবাদ করা হয়। মৌসুম শেষে লাভের টাকা দিয়ে দেনা শোধ করার পরিকল্পনা থাকলেও ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেই হিসাব এলোমেলো হয়ে গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর-এর অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) কৃষ্ণ রায় বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব থাকলেও তা খুব বেশি হবে না। উৎপাদন ব্যয় কিছুটা বাড়লেও প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সমন্বয় করেই কৃষি কার্যক্রম চালানো সম্ভব।
এবার চুয়াডাঙ্গা জেলার চারটি উপজেলায় প্রায় ৩৫ হাজার ২৩৬ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ ফসল সংগ্রহে নির্ভর করতে হয় কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার, থ্রেসারসহ বিভিন্ন কৃষিযন্ত্রের ওপর, যেগুলোর বেশিরভাগই ডিজেলচালিত।
ফলে আর কদিন পরই ধান কাটার মৌসুম শুরু হলে কৃষকদের ওপর আরও এক দফা জ্বালানি ব্যয়ের চাপ নামবে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সংগঠন কৃষক জোটের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান আলীর মতে, জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু কৃষকের খরচেই সীমাবদ্ধ থাকে না; শেষ পর্যন্ত তা খাদ্যপণ্যের বাজারেও প্রভাব ফেলে।
উৎপাদন ব্যয় বাড়লে ধানের দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়, যা ভোক্তা পর্যায়েও পৌঁছে যায়।