সম্পাদকীয়
ভারতের ফারাক্কা বাঁধ বাংলাদেশের জন্য যে এক মরণফাঁদস্বরূপ, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আন্তর্জাতিক নদী আইন পদদলিত করে উজানের দেশ ভারত একতরফাভাবে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার করায় নদীমাতৃক বাংলাদেশ ক্রমেই মরুকরণের পথে হাঁটছে। আমাদের প্রাণ-প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু ও বাস্তুতন্ত্রের যে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে, তার দায় কোনো বাঁধ বা ট্রিটির আড়ালে লুকানোর নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে উজানের পানির প্রবাহ বন্ধ হওয়ায় লবণাক্ত সমুদ্রের পানি ক্রমশ উত্তরমুখী হচ্ছে, ঢুকে যাচ্ছে মূল ভূখণ্ডের বিশাল এলাকায়। এতে চরম হুমকির মুখে পড়ছে কৃষি, মৎস্য ও কোটি মানুষের জীবনজীবিকা।
শক্তিশালী প্রতিবেশী ভারতের কাছে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের প্রচেষ্টায় কূটনৈতিকভাবে ব্যর্থ হয়ে বাংলাদেশ অবশেষে বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে নিজের পথ খুঁজেছে। পদ্মা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণের সেই সাহসী উদ্যোগকে তাই জাতীয় স্বার্থে সাধুবাদ জানাতেই হয়। এই যুগান্তকারী প্রকল্পের মাধ্যমে বর্ষাকালের বিশাল পানির কিছু অংশ ধরে রেখে তা শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা ও তার অন্তত পাঁচটি শাখানদীতে প্রবাহিত করার পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে দূরদর্শী।
তবে আমরা ভুলতে পারি না, একথা মানতে হবে যে, এই ব্যারাজ ফারাক্কার সমুদয় ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারবে না। তবে পরিস্থিতির খানিকটা উন্নতি করতে পারবে। দক্ষিণ-পশ্চিম ও পশ্চিমাঞ্চলের পদ্মার শাখা নদীগুলো খানিকটা পানি পাবে; কমবে লবণাক্ততা, বাঁচবে ফসল, ফিরবে প্রাণ। এই প্রকল্প আমাদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথে এক পদক্ষেপ, অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে নিজের ভূগোলকে নিজের প্রযুক্তিতে বাঁচানোর প্রচেষ্টা।
এখন থেকে অর্ধশতাব্দী আগে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পদ্মার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে ঐতিহাসিক লংমার্চ করেছিলেন। লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণ সেই লংমার্চকে যেমন মহিমান্বিত করেছিল, তেমনি আন্তর্জাতিক নদীর পানির ওপর আমাদের যে অধিকার, বহির্বিশ্বের কাছে আমরা তা তুলে ধরতে পেরেছিলাম।
ফারাক্কা লংমার্চের অর্ধশতাব্দীপূর্তিতে আমরা মনে করিয়ে দিতে চাই, পদ্মা নদীতে একটি ব্যারাজ সব সমস্যার সমাধান নয়। অভিন্ন ৫৪টি নদী থেকে ভারত যেভাবে একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তা নিয়ে শোরগোল তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, এখন আর শেখ হাসিনার জমানা নেই। এখনকার বাংলাদেশের নাগরিক, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এই দেশের কোনো ন্যায্য দাবিতে ছাড় দিতে চায় না। গঙ্গা-পদ্মার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে দলমতনির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। জাতির প্রয়োজনে সব সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে সর্বাত্মক ঐক্যই পারে অধিকার আদায় করতে।