সম্পাদকীয়
১৭ জুলাই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ইতিহাসে এটি একটি কলঙ্কজনক ও শোকাবহ দিন। ঠিক এক বছর আগে এই দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আজিজুর রহমান হল-সংলগ্ন পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয় আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহর নির্জীব দেহ। যে দিনটি শুরু হয়েছিল প্রাণের স্পন্দনে, শেষ হয়েছিল এক অনিশ্চিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রহস্যে। কিন্তু তার পরের কাহিনি আরও করুণ। এক বছরেও খুনিদের পরিচয় জানা যায়নি, হত্যার বিচার হয়নি, প্রশাসনের আশ্বাসবাণী কেবল দীর্ঘ হয়েছে।
প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে সাজিদের। কিন্তু ফরেনসিক ও ভিসেরা রিপোর্ট স্পষ্ট প্রমাণ দেয়, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত শ্বাসরোধে হত্যা, এবং তারপর লাশ পুকুরে ফেলে দেওয়া। অথচ এক বছর পরও বিচারহীনতা আমাদের প্রশ্ন করতে বাধ্য করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হত্যার যদি ন্যায্য বিচার না হয়, তাহলে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা থাকে কোথায়? শিক্ষক-শিক্ষিকা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী- কোনো পক্ষই যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারেনি।
গত এক বছরে আমরা দেখেছি একের পর এক তদন্ত কমিটি গঠন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তার ঘোষণা, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, মানববন্ধন, আন্দোলন। কিন্তু সবই ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি সাজিদের বিভাগকে আন্দোলন পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে পরে সে আন্দোলনকে গতিশীল রাখতে না পারার ব্যর্থতার দায়ও শিক্ষার্থীরা এড়াতে পারেন না। এই বিচারহীনতা যে পরবর্তী অপরাধের উর্বর ভূমি তৈরি করে, তা আমরা দেখেছি সদ্য অতীতে।
তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন করলে দায়িত্বপ্রাপ্তদের যে জবাব আসে, তা মোটেই সন্তোষজনক নয়। যেখানে সিসিটিভি ফুটেজ রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যেখানে তদন্তের স্বার্থে যাকে ইচ্ছা তাকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছে, সেখানে এতো শৈথিল্য মানা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি তো কাজ খানিকটা এগিয়েই দিয়েছিল। তারপরও খুনিদের খুঁজে বের করতে এতো সময় লাগা রীতিমতো রহস্যজনক।
নিহত সাজিদের বাবা যখন বলেন, ‘তাহলে কি বিচার হবে না?’, এই বাক্যটি শুধু এক বাবার আর্তনাদ নয়, এটি একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে অভিশাপ।
বর্তমান উপাচার্য এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক হওয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা আরও বেড়েছে। শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো বিবেচনা করে তিনি যদি সাজিদ হত্যার বিচার দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করতে তার প্রভাব খাটান, তবে তা অনেক কার্যকর হতে পারে। তবে শুধু উপাচার্যের ওপর নির্ভর করলে চলবে না; প্রয়োজন সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের আন্তরিক ও সমন্বিত উদ্যোগ, সংবাদমাধ্যমের নজরদারি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারত্ব এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের সদিচ্ছা।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি কবর রচিত হওয়ার কথা ছিল ফ্যাসিবাদী সরকার উৎখাতের মধ্য দিয়ে। কিন্তু আজও কেন সাজিদের বাবা বিচার চেয়ে আর্তনাদ করবেন? ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন কতদূর?