গণঅভ্যুত্থান
রাশেদ খান
জুলাইয়ের চেতনা কী? জুলাইকে কেন ধারণ করা লাগবে? জুলাই দেশের জন্য ভালো কী বয়ে এনেছে?- এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হয়েছি অনেকবার, অনেকের কাছে। যারা এই প্রশ্নগুলো তোলে তাদের নির্দ্বিধায় ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ টাইপের ট্যাগিং করার সুযোগ আছে। কিন্তু সেই সুযোগটা নিলে রক্তক্ষয়ী জুলাইকে বোঝা যাবে কি? জুলাইকে ইতিহাসের আতশী কাচের নিচে ফেলে একটু কাটাছেড়া করতে হবে।
যুগ যুগ ধরে চলে আসা যে কোনো কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে শোষিতের গণজোয়ার আসতেই হবে! ইতিহাস সেটাই বলে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে রেজা পাহলভি, ফার্দিনান্দ মার্কোস, এরশাদ, হোসনি মোবারকরা নিকটবর্তী উদাহরণ হিসেবে আছে। ভোটচোর, লুটপাটকারী, আওয়ামী লীগ ও তাদের ল্যাস্পেন্সার ব্যতীত দেশের সকল জনগণকে কার্যত দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা শেখ হাসিনা রেজিমের বিরুদ্ধে এই গণবিস্ফোরণ অবশ্যম্ভাবী ছিলো। এদেশে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অন্য কোনো লগ্নে হলেও ‘জুলাই’কে আসতেই হতো।
হাসিনাশাহীর বিরুদ্ধে তৎকালীন সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের তোয়াক্কা না করে অনলাইনে-রাজপথে সরব থাকা এই আমরা এটা বিশ্বাস করতাম। বিশ্বাস করতাম দেখেই ফেব্রুয়ারি ২০২৪ এর নির্বাচনে ভোটের মাঠে ঘুঘু চড়েছিলো। ওটা ছিলো পূর্বাভাস!
ছাত্রদের নেতৃত্বে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে শুরু হলেও, শাসকগোষ্ঠীর স্বভাবসুলভ দমনপীড়নের ফলে যে গণবিক্ষোভ শুরু হয় তার মূল নায়ক এদেশের অনুভূতিপ্রবণ, বিবেকবান জনগণ। জনগণ ভুল বুঝে রাস্তায় নামেনি। অগণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা স্বৈরাচারকে গদি ছাড়া করতেই জনগণ রাস্তায় নেমেছিলো। আর গণরায় কখনো ভুল হতে পারে না। তাই মার্কিন সাম্রাজবাদের সহায়তায় ‘ম্যাটিকুলাস ডিজাইন’ নামক রাশভারী শব্দ ব্যবহার করে যারা খুনি হাসিনার ‘পাপ লঘুকরণ প্রকল্প’ হাতে নিতে চায়, তারা মূলত গণরায়কেই অস্বীকার করে। অবশ্য, ভোটচোর আর সুবিধাবাদীদের কাছে ‘জনগণ’ আবার কী জিনিস!
মুশকিলটা হলো, এই ছাত্র, খেটেখাওয়া শ্রমিক, পেশাজীবী, গৃহিণী, বেকারদের একক কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ছিলো না। তবে জুলাইয়ে তারা হয়ে উঠেছিলো একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য আদায়ে একক এজেন্সি। হাসিনাকে তাড়ানোর পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যে ভ্যাকুয়াম তৈরি হয়, সেটা এই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত নায়কেরা অর্থাৎ সাধারণ জনগণ পূরণ করতে পারেনি। সে জায়গাটা দখল করেছিলো মার্কিন দালাল, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি আর উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি। সরকারবিহীন তিনটা দিন, কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে, কারা সরকার গঠন করছে? গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় স্টেকহোল্ডার এই জনগণকে কার্যত বিষয়গুলো জানতে দেওয়া হয়নি।
পরের ঘটনাপ্রবাহগুলো আমাদের সবারই জানা। একের পর এক নৈরাজ্য, জাতিগত ঘৃণা উসকে দেওয়া, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়ন, নারীর প্রতি বিদ্বেষ, মহান মুক্তিযুদ্ধকে জুলাই আর সাতচল্লিশ দ্বারা প্রতিস্থাপনের চেষ্টা, কথিত মোরাল পুলিশিং, মব সন্ত্রাস, পীর-ফকির-সাধুদের ওপর অত্যাচার, মাজার গুঁড়িয়ে দেওয়া, কবর থেকে লাশ তুলে পোড়ানো, ব্লাসফেমি ট্যাগে মানুষ পুড়িয়ে মারা, নিরীহ মানুষ ধরে ধরে মামলা বাণিজ্য, ভাস্কর্য ভাঙা, কুখ্যাত জঙ্গি আর যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দেওয়া, স্বাধীন মত প্রকাশে বাধা, উদীচী-ছায়ানট-ডেইলি স্টার-প্রথম আলোর মতো প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দেওয়া, অভ্যুত্থানকারী ছাত্রনেতাদের ফুলে ফেঁপে ওঠা, দ্বৈত নাগরিকদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া, বন্দর লিজ দেওয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যচুক্তি- এই সবকিছু চলেছে প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রীয় মদদে/নির্লিপ্ততায় এবং জুলাইয়ের নাম ভাঙিয়ে।
পাশাপাশি জনগণের জীবিকা, কর্মসংস্থান, শ্রমের ন্যূনতম মজুরি, শিক্ষা, চিকিৎসার মতো জনগুরত্বপূর্ণ বিষয় পাশ কাটিয়ে কথিত সনদ, সংস্কার, ঐকমত্য কমিশন, সংবিধান সংশোধন নিয়ে বচসায় মেতে উঠেছিলো গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ।
‘জুলাইয়ের চেতনা কী? আর জুলাই এদেশকে কী দিয়েছে?’- প্রশ্নগুলো যারা করে তাদেরকে আমি ‘স্বৈরাচারের দোসর’ বলে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে পারি না। অথচ জুলাই সংঘটিত হয়েছিলো টিন-এজ, তরুণ, বৃদ্ধ, নারী, হিন্দু, আদিবাসী, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, ডানপন্থি, বামপন্থি সবার সমন্বয়ে। জুলাইয়ের দেয়ালে দেয়ালে ফুটে উঠেছিলো অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ, কাঠামোগত সংস্কার, ধর্মীয় সম্প্রীতি, বাকস্বাধীনতা আর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার স্লোগান।
প্রশ্ন হলো, আমাদের আকাঙ্ক্ষা কি আদৌ পূরণ হয়েছে? না, জনগণের সেই আকাঙ্ক্ষাগুলো পূরণ হয়নি। বরং তা ধূলিসাৎ হয়েছে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের পালিত উগ্র দক্ষিণপন্থিদের কাছে। তবে, তাতে স্বৈরাচারের বন্দুকের নলের বিপরীতে রক্তক্ষয়ী বীরোচিত প্রতিরোধের জুলাইয়ের মর্যাদা একটুও কমে না। শহীদ ওয়াসিম, মুগ্ধ, জাবের, রিয়া গোপদের জীবনের বিনিময়ে যে জুলাই; বৈষম্যহীন, মানবিক মর্যাদা আর ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় যে জুলাই, তা এদেশের জনগণ এখনো লালন করে। যেমনটা লালন করে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। একাত্তর-পরবর্তী রক্ষীবাহিনীর নৈরাজ্য, লুটপাটে যেমন মহান মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় না; তেমনি কিছু অর্থ-ক্ষমতালোভী ছাত্রনেতা, উগ্র দক্ষিণপন্থি, সাম্রাজ্যবাদী দালালের কর্মকাণ্ডে জুলাইয়ের আবেদন হারিয়ে যায় না।
এদেশের মুক্তিকামী জনগণের দুর্ভাগ্য, সুদিন কাছে টানার জন্য বার বার জীবন দেওয়া লাগে, অস্ত্র হাতে যুদ্ধে যেতে হয়, নব্বইয়ে, জুলাইয়ে রাস্তায় নামতে হয়...
লেখক: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে যশোরের মূল সংগঠক
*মতামত লেখকের নিজস্ব