সুবর্ণভূমি ডেস্ক:
কিছু কিছু বাড়ি আছে, যা কেবল বাড়ি নয়- একধরনের বাতিঘর। এ ধরনের বাস্তবতা নিয়ে নিজের ফেসবুকে লিখেছেন বহুমুখী প্রতিভাধর কথাসাহিত্যিক, মোটিভেশনাল স্পিকার বাদল সৈয়দ। যা সুবর্ণভূমির পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:
১৯৮৭- ৯২ সাল।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একটি বাড়িতে টিউশনি করতাম। এ বাড়ির মানুষদের কাছ থেকে আমি কিছু ব্যাপার শিখেছিলাম- যা এখনো আমার জীবনে হীরকখণ্ড হয়ে রয়ে গেছে।
বাড়িটি ছিল আসকারদীঘির পাড়ে।
বেশ ধনী ব্যবসায়ী পরিবার।
সে বাড়িতে পড়াতে গেলে প্রায় প্রতিদিন আমার কয়েকটি অভিজ্ঞতা হতো-
১) গাড়ি বারান্দায় দেখা হতো বাড়ির গৃহকর্তার সাথে। তিনি ছিলেন ছাত্রের দাদা। তিনি তাঁদের পারিবারিক ব্যবসার প্রধান ছিলেন।
আমি যখন যেতাম তখন তিনি গাড়ি বারান্দায় হাঁটতেন। খুবই রাশভারি মানুষ কিন্তু আমাকে দেখলেই এগিয়ে এসে হেসে জিজ্ঞেস করতেন, ‘বাবা, ভালো আছেন?’
তাঁর প্রতিদিন নরম স্বরে করা এ স্নেহ মেশানো প্রশ্ন আমাকে শিখিয়েছিল, বিপুল বিত্ত এবং ক্ষমতা থাকার পরও মানুষ কতটা বিনয়ী ও স্নেহময় হতে পারে।
২) একতলার মুখে দেখা হতো তাঁর মেয়ের সাথে। ছাত্রের ফুপু। সম্ভবত নাম ছিল বনি। আমাকে দেখলেই তিনি এগিয়ে আসতেন। সাথে তাঁর দুটো ফুটফুটে মেয়ে। বনি আপা তাদের মিষ্টি হেসে বলতেন, ‘স্যারকে সালাম দাও। কেমন আছে জিজ্ঞেস করো।‘
ফুটফুটে শিশু দুটো একসাথে হাত কপালে তুলে বলত, 'আসসালামুলাইকুম স্যার। আপনি ভালো আছেন?’
বনি আপা শিখিয়েছিলেন, শিক্ষকের প্রতি কীভাবে সন্তানের মনে শ্রদ্ধা তৈরি করতে হয়।
৩) দোতলার ল্যান্ডিংয়ে দেখা হতো বাড়ির মেজছেলের সাথে। তিনি ছিলেন একটি বিদেশি ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। সম্ভবত নাম ছিল ইফতেখার। তাঁর সঙ্গে দেখা হলে মাথা ঝাঁকিয়ে বলতেন, ’হোপ দ্যা ডে ওয়াজ ফাইন।‘
তাঁর প্রতিদিনের এই কথাটি একটি ব্যাপার আমার মাথায় গেঁথে দিয়েছিল, তা হচ্ছে, প্রতিটি দিন আসলে আলাদা। অসংখ্য সুন্দর দিন মিলে তৈরি হয় সুন্দর একটি জীবন এবং দিনগুলো সুন্দর করার দায়িত্ব আমার।
৪ ) তিনতলায় সম্ভবত ছাত্রের দাদা-দাদি তাঁদের অবিবাহিত পুত্রকে নিয়ে থাকতেন। এই পুত্র চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। সেই বয়সেই ছিলেন বিখ্যাত সেলিব্রেটি।দেশজোড়া খ্যাতি।
একদিন এই সেলিব্রিটির সাথে চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমিতে দেখা হলো। অসংখ্য তরুণ, বিশেষ করে মেয়েরা তাঁকে ঘিরে আছে। আমি পাশ কাটিয়ে চলে আসছি, তিনি ভিড়ের মধ্য থেকে গলা উঁচু করে বললেন, 'কই যাচ্ছেন?'
আমি তখন তাঁদের বাড়িতেই ছাত্র পড়াতে যাচ্ছিলাম। তাই বললাম,'আপনাদের বাসায়। সাজিদকে পড়াতে যাচ্ছি।'
তিনি বললেন, ' দাঁড়ান, আমিও বাসায় যাব। একসঙ্গে যাওয়া যাবে।'
তিনি ড্রাইভ করে তাঁর গাড়িতে আমাকে বাসায় নিয়ে গেলেন। অথচ অতি বিখ্যাত মানুষটির একজন গৃহশিক্ষকের দিকে খেয়াল কোনো দরকার ছিল না।
যতবার দেখা হতো তিনি খুব আন্তরিকভাবে কথা বলতেন। তাতে সেলিব্রিটির উত্তাপ থাকত না।
তাঁর কাছ থেকে শিখেছিলাম- সত্যিকারের খ্যাতি মানুষকে আরো বড় করে। অহংকারী করে না।
৫) চারতলায় ছাত্রের বাবা-মা থাকতেন। তার বাবার নাম ছিল মোহাম্মদ আলি। তিনি ছিলেন খুব গম্ভীর টাইপ মানুষ। আমি যখন পড়াতে যেতাম তখন তিনি বাড়ি ফিরতেন। কোনো কথা বলতেন না, কিন্তু মাথা ঝুঁকিয়ে আমার প্রতি সম্মান দেখাতেন।
সে ভঙ্গিই আমাকে শিখিয়েছিল একটি শব্দ উচ্চারণ না করেও কীভাবে মানুষকে সম্মান দেখানো যায়।
৬) সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতা হয়েছিল গ্লোরিয়া ভাবির কাছ থেকে। তিনি আমার ছাত্র সাজিদের মা। ও ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ায় জুন মাসে বার্ষিক পরীক্ষা হয়ে যেত। তারপর দুমাসের জন্য স্কুল ছুটি। আমি তখন পড়াতে যেতাম না। কিন্তু ভাবি আমাকে এ দুমাসের বেতন একসঙ্গে দিয়ে দিতেন।
আমি না পড়িয়ে টাকা নিতে সংকোচ করলে তিনি বলতেন, ' ওয়ান্স অ্যা টিচার ইজ অলওয়েজ অ্যা টিচার। পড়াও বা না পড়াও তুমি সাজেদের টিচার। স্কুল বন্ধ বলে কিছুদিন পড়াবে না, এই যা।'
কী অসাধারণ চিন্তা, তাই না?
তাঁর কাছ থেকেই আমি শিখেছি, যিনি একদিনও পড়িয়েছেন তাঁকে আজীবন শিক্ষক মান্য করতে হয়।
এই লেখা পড়তে পড়তে হয়তো আপনি ভাবছেন, এই বাড়ির বিখ্যাত সেলিব্রিটি পুত্রটি কে?
তিনি হচ্ছেন সোলসের বিখ্যাত গায়ক নাসিম আলি।
আশি বা নব্বই দশকে সোলস ছিল আমাদের প্রজন্মের ক্রেজ। এর নাম উচ্চারিত হলে বুকে উদ্দাম বাজনা বাজত। এর প্রত্যেক সদস্য ছিলেন তরুণদের স্বপ্নপুরুষ।
আর এই সেলিব্রিটি আমাকে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিতে!
ভাবা যায়!
কিছু কিছু বাড়ি আছে, যা কেবল বাড়ি নয়- একধরনের বাতিঘর।
আসকারদীঘির পাড়ের সেই বাড়িটিও ছিল তাই।