বিশেষ প্রতিনিধি
, যশোর
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তফা ফরিদ আহমেদ চৌধুরী (বায়ে) এবং পৌরসভার সাত নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আওয়ামী লীগ নেতা আসাদুজ্জামান বাবলুর সাথে সেলিম রেজার (বৃত্তদ্বারা চিহ্নিত) ফাইল ছবি। এগুলো তার ফেসবুক পেইজ থেকে সংগ্রহ করা
ছবি:
একটি বেসরকারি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের এক নারী মেডিকেল প্রমোশন কর্মকর্তা (এমপিও) তার ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, ক্ষমতার অপব্যবহার, বেআইনি চাকরিচ্যুতি, বেতন বঞ্চনা এবং মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন।
বিষয়টি নিয়ে প্রতিকার চেয়ে ওই নারী স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা রাইটস যশোরের কাছে লিখিত আবেদনও করেছেন।
অভিযোগকারী ওই কর্মচারী দাবি করেছেন, গত ৯ এপ্রিল তিনি ‘মেডিকেল প্রমোশন অফিসার’ পদে ‘এপেক্স ফার্মা’য় যোগদান করেন। নিয়োগপত্র অনুযায়ী তার মাসিক বেতন ২০ হাজার টাকা। টিএ-ডিএ সাত হাজার টাকা। শর্ত অনুযায়ী টার্গেট পূরণ করলে তার অতিরিক্ত ভাতা পাওয়ার কথা ছিল।
তিনি দাবি করেছেন, চাকরিতে যোগদানের পর থেকে প্রতিষ্ঠানের রিজিওনাল ম্যানেজার সেলিম রেজা তাকে অশালীন ও অনৈতিক প্রস্তাব দিতে থাকেন। এসব প্রস্তাব সেলিম রেজা অভিযোগকারীর ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপে একের পর এক মেসেজের মাধ্যমে দিতে থাকেন; যার ক্রিনশট এই প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।
রিজিওনাল ম্যানেজারের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ওই নারী কর্মীকে নানাভাবে হয়রানি করা হয় এবং পরবর্তীতে চাকরি থেকে অবৈধভাবে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হয় বলে ভুক্তভোগী দাবি করেছেন।
লিখিত অভিযোগে ওই নারী কর্মী উল্লেখ করেন, চাকরিতে যোগদানের মাস থেকেই তার বেতনের একটি অংশ কেটে রাখা হয়। পরে বিষয়টি জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বিভিন্ন অজুহাত দেন এবং আশ্বাস দিলেও সেই অর্থ আর পরিশোধ করা হয়নি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, একপর্যায়ে ওই কর্মকর্তা ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রস্তাব দেন। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তায় তিনি অভিযোগকারীকে একান্তে দেখা করার আহ্বান জানান এবং দাবি করেন, তার কথায় রাজি হলে আগের মাসে কেটে রাখা টাকা ফেরত দেওয়া হবে, চাকরিও নিরাপদ থাকবে এবং বেতন বাড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা সম্ভব।
অভিযোগকারী বলেন, তিনি ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং জানান, তিনি শুধুমাত্র চাকরি করতে এসেছেন। এরপর থেকেই তার প্রতি রিজিওনাল ম্যানেজার সেলিম রেজার আচরণ আরও কঠোর হয়ে ওঠে।
আবেদনে তিনি দাবি করেন, পরে তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ এনে একটি সতর্কীকরণ (ওয়ার্নিং) চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু ওই অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। তার ভাষ্য, তিনি নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এর প্রমাণও রয়েছে।
সংযুক্ত হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের স্ক্রিনশট অনুযায়ী, সতর্কীকরণ চিঠি পাওয়ার পর তিনি রিজিওনাল ম্যানেজার সেলিম রেজাকে লিখিতভাবে জানান যে, অভিযোগগুলো সঠিক নয় এবং তার কাছে এর বিপরীতে যুক্তি ও প্রমাণ রয়েছে। জবাবে ওই কর্মকর্তা তাকে প্রেসক্রিপশন না পাঠানোর কথা বলেন এবং চাকরি টিকিয়ে রাখা নিয়েও মন্তব্য করেন।
অভিযোগে ওই নারী আরও উল্লেখ করেন, তার প্রাপ্য বেতন পরিশোধ না করে চাকরি থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে তিনি আর্থিক ও মানসিকভাবে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, প্রাপ্য বেতন পরিশোধ, বেআইনি চাকরিচ্যুতির প্রতিকার এবং যৌন হয়রানির অভিযোগের বিচার দাবি করেছেন।
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে এপেক্স ফার্মার রিজিওনাল ম্যানেজার সেলিম রেজা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। হোয়াটসঅ্যাপের স্ক্রিনশটের উল্লেখ করলে তিনি বলেন, ‘ওগুলো কম্পিউটারে এডিট করে তৈরি করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, চুক্তিপত্র অনুযায়ী ওই নারী কর্মী তার যোগ্যতা ও দক্ষতার প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তাকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, অভিযোগকারীর যে নিয়োগপত্র রয়েছে তাতে তার চাকরির ‘শিক্ষানবিশ কাল’ হিসেবে ছয় মাসের উল্লেখ রয়েছে। নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর করেছেন এপেক্স ফার্মার সহকারী ম্যানেজার (এইচআর অ্যান্ড অ্যাডমিন) এ এফ এম মনিরুজ্জামান।
মানবাধিকার সংস্থা রাইটস যশোরের ডেপুটি ম্যানেজার এস এম আজহারুল ইসলাম বলেন, চাকরিতে এদেশের নারীরা এখনো যে সুরক্ষিত নন এই ঘটনা তার একটা বড় উদাহরণ। এটি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
বিষয়টি নিয়ে রাইটস যশোর যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে জানিয়েছেন তিনি।