সম্পাদকীয়
যশোরের অনেক বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বাংলাদেশ পারমাণবিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের নিরাপত্তা নির্দেশনা উপেক্ষিত হচ্ছে মর্মে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে সুবর্ণভূমিতে। এই সংবাদটি সবদিক দিয়েই অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আইন অমান্য করে যত্রতত্র এক্স-রে ও সিটি স্ক্যান মেশিন পরিচালনা কেবল অবৈধই নয়, বরং তা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক অপূরণীয় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে ওই প্রতিবেদনে আশঙ্কা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিকিরণঝুঁকিতে পড়ছেন রোগী, স্বজন এবং স্বয়ং স্বাস্থ্যকর্মীরাও। অথচ এই বিপজ্জনক কাজ কর্তৃপক্ষের চোখে পড়ছে না- এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
পানিবিনি আইন-১৯৯৩ ও বিধিমালা-১৯৯৭-এর বিধি-৯৫ স্পষ্টভাবে লাইসেন্স ব্যতীত কোনো প্রতিষ্ঠানে বিকিরণ-নির্গত যন্ত্র পরিচালনা নিষিদ্ধ করেছে। এক্স-রে কক্ষের দেয়াল দশ ইঞ্চি পুরু, দরজায় সিসার পাতের সুরক্ষা এবং টেকনোলজিস্টদের জন্য লেড অ্যাপ্রন ও টিএলডি ব্যাজ ব্যবহার বাধ্যতামূলক। কিন্তু প্রতিবেদক দেখতে পেয়েছেন, টিনের ছাউনি, সাধারণ কাচের দরজা, এমনকি কাপড়ের পর্দা দিয়ে চলছে এক্স-রে কার্যক্রম। এসব প্রতিষ্ঠানে রোগীর স্বজনদের পর্যন্ত কক্ষে প্রবেশ করানো হচ্ছে; যা সুস্থ মানুষের শরীরে সরাসরি আয়নাইজিং রেডিয়েশন পৌঁছে দেওয়ার নামান্তর।
বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছেন, অতিরিক্ত রেডিয়েশন কোষের ডিএনএ ধ্বংস করে, যা থেকে বন্ধ্যাত্ব, লিউকেমিয়া ও অন্যান্য মারণব্যাধি দেখা দিতে পারে। গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য তো এটি আরও ভয়াবহ। অথচ যশোরের স্বাস্থ্য প্রশাসন ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বছরের পর বছর এই অনাচার দেখেও দেখে না। লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে; নিয়মিত তদারকি বা আইনের প্রয়োগ বলতে কিছু নেই।
আমরা মনে করি, এই উদাসীনতা আর চলতে পারে না। যশোরের সিভিল সার্জন অনতিবিলম্বে সব বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র জরিপ করে আইন মান্যকারী প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করুন। একইসাথে নির্দেশনা লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। লাইসেন্স ছাড়া পরিচালিত যন্ত্র তাৎক্ষণিক বন্ধ করার পাশাপাশি জরিমানা ও মামলার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া বাংলাদেশ পারমাণবিক গবেষণা ইনস্টিটিউটকে মনিটরিং জোরদার করতে হবে এবং জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ নিরাপদ ডায়াগনস্টিক সেন্টার চিহ্নিত করতে পারেন।
জীবন ও স্বাস্থ্যের প্রশ্নে আপস নয়। পারমাণবিক নিরাপত্তা বিধিমালা শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেও কার্যকর করতে হবে। যশোরের এই ঘটনা সারা দেশের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। এখনই পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এই বিকিরণজনিত রোগের বোঝা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বিপন্ন করে তুলবে। সুতরাং, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করতে হবে এবং তা এখনই।