যশোর, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

অনলাইনে নয়, কৃষি বা ব্যবসা শিখতে হবে শেকড় থেকে

মো. মিজানুর রহমান

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই,২০২৬, ১১:০০ এ এম
অনলাইনে নয়, কৃষি বা ব্যবসা শিখতে হবে শেকড় থেকে

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট কর্মহীন বা বেকার মানুষের সংখ্যা ২৬ লাখ ২০ হাজার। এর মধ্যে উচ্চশিক্ষিত বা স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা প্রায় নয় লাখ। দেশে কর্মসংস্থানের ঘাটতি থাকায় উচ্চশিক্ষিত ছেলে-মেয়েরা চাকরির পিছে ছোটে। নিয়োগ পরীক্ষার তুমুল প্রতিযোগিতায় টিকে অল্পকিছু লোকের কর্মসংস্থান হয়। এর মধ্যে অনেকেই তাদের যোগ্যতার থেকে নিম্নপদের চাকরিতে যোগদান করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। তবে একটি বড় অংশই যথাযথ প্রস্তুতি না নিয়ে চাকরির পিছে ছুটে যেমন সময়ক্ষেপণ করে তেমনি কারিগরি শিক্ষার অভাবে উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে বেগ পেতে হয়। চাকরির বয়স শেষে বেকার এই জনগোষ্ঠী সহজে বা শর্টকাট পদ্ধতিতে কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়, তা বেড়ায়। ইউটিউবে বিভিন্ন ব্যক্তির মোটিভেশনাল বক্তব্য শুনে, কৃষি এবং ব্যবসায়ে সফল ব্যক্তিদের বক্তব্য শুনে কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই তাদের মতো উদ্যোক্তা হতে নেমে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে ইউটিউবে এইসকল বিষয়ের ওপর বিভিন্ন ভিডিও দেখা যায়, যেখানে দেখানো হয় মানুষ কতো সহজে-

১. ছাদে শিং মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছে;

২. বাড়ির উঠোনে চৌবাচ্চা করে অল্প জায়গায় মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষ করে আর্থিকভাবে সচ্ছল হচ্ছে;

৩. বাড়ির ছাদে ছাগল/দুম্বা পালন করে সফল খামারি হচ্ছে;

৪. বাড়ির আঙিনায় আঙুর চাষ করে এলাকায় সাড়া ফেলে দিচ্ছে;

৫. বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করে দেশে চড়া দামে বক্রি করে সফল ব্যবসায়ী হচ্ছে;

৬. নতুন পণ্যের ডিলারশিপ নিয়ে বড় ব্যবসায়ী বনে যাচ্ছে;

৭. মাত্র পাঁচটি সেলাই মেশিন দিয়ে যাত্রা করে ৫০ জন শ্রমিকের কারখানা বানিয়ে ফেলছে;

৮. মোটর পার্টসের ব্যবসায় প্রায় শতভাগ লাভ করছে;

৯. অল্প পুঁজিতে কসমেটিক্সের ব্যবসায় সফল হচ্ছে;

১০. রাখি মালের ব্যবসায় শুধু পণ্য কিনে মজুদ করেই রাতারাতি ধনী হয়ে যাচ্ছে প্রভৃতি।

হ্যাঁ, এরকম অনেকের ক্ষেত্রেই হচ্ছে, কিন্তু এই অনেকেই হঠাৎ করে কৃষি বা ব্যবসায় আসেনি। আজ যে ছেলেটা স্নাতকোত্তর পাশ করে শিক্ষিত হয়েছে তারই কিছু বন্ধু পারবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে ছাত্রাবস্থায় স্কুল-কলেজ হতে ঝরে গিয়েছিল। তাদের অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হতে দূরে সরে গিয়ে বাবার সাথে কৃষি কাজে যোগ দিয়েছিল; ব্যবসায়ে যোগ দিয়েছিল। যাদের আর্থিক অবস্থা আরও খারাপ ছিল তারা কোনো মেকানিকের সহযোগী হয়েছিল, গ্যারেজের কাজে যোগ দিয়েছিল, ব্যবসায়ীর কর্মচারী হয়েছিল। ২৪-২৫ বছর বয়সে যখন একজন ছাত্র স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিচ্ছে, ওই বয়সে আরেকজনের মাঠ পর্যায়ে একটি নির্দিষ্ট পেশায় বা কাজের অভিজ্ঞতা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০-১২ বছর। এই সময়ে অনেকেই বাবার কৃষি কাজকে হাতে নিয়ে তা খামারে রূপ দিয়েছে, মেকানিকের সহযোগী থেকে নিজেই গ্যারেজ করেছে, দোকানির কর্মচারী নিজে বড় ব্যবসায়ী বনেছে। একজন ছাত্র যে সময়ে বিদ্যা-শিক্ষা নিয়েছে সেই সময়ে ঝরে পড়া ছাত্রটি শিক্ষায় বঞ্চিত হয়ে কারিগরি বা হাতেকলমে কাজ শিখেছে। সফল উদ্যোক্তা হিসেবে সমাজে পরিচিতি পেয়েছে।

স্কুল-কলেজ ঝরেপড়া ছাত্ররা স্বাবলম্বী হলেও তারা যেমন স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে উচ্চশিক্ষিত হতে পারেনি তেমনি উচ্চশিক্ষিত হয়ে ইচ্ছা করলেই উদ্যোক্তা বন্ধুর সফলতায় মুগ্ধ হয়ে রাতারাতি তাদের মতো হওয়াও সম্ভব নয়। ছাত্রাবস্থায় যেমন স্কুল-কলেজ থেকে ঝরেপড়া উদ্যোক্তা বন্ধুর দুর্দিনগুলো নজরে পড়ে না, তেমনি ইউটিউবে যেসব সফলতা দেখানো হয়, তার পেছনে অনেক কষ্ট থাকে, যা সফল মানুষেরা সামনে আনে না। যারা এসব কনটেন্ট তৈরি করে তারা মূলত এই বেকারত্বে ভোগাদের উৎসাহিত করে কন্টেন্টের ভিউ বাড়ায়। তাই ইউটিউব দেখে হঠাৎ করে কৃষি ও ব্যবসায়ের উদ্যোক্তা হলে আর্থিক ক্ষতিতে পড়ার আশঙ্কাই বেশি থাকে।
বেকারত্ব থেকে মুক্তি পেতে উদ্যোক্তা হতে চাইলে কৃষি বা ব্যবসা শেকড় থেকে শিখতে হবে। লেখাপড়া শেষে উদ্যোক্তা হতে করণীয়-

১. যে খাতে বিনিয়োগ করে উদ্যোক্তা হতে চান সমজাতীয় কৃষি বা ব্যবসায় সফল ব্যক্তির সহযোগী হয়ে কাজ করতে হবে;

২. নিজের শারীরিক ও মানসিক শক্তিকে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করতে হবে;

৩. কৃষক/ব্যবসায়ীদের নিজস্ব কালচার আছে। নিজেকে সেই কালচারের সাথে খাপ খাওয়াতে হবে;

৪. সব কাজ শ্রমিক/কর্মচারীদের দিয়ে করিয়ে নেওয়ার প্রবণতা পরিহার করতে হবে;

৫. কৃষি এবং ব্যবসায়ের মৌসুম বুঝতে হবে;

৬. শিক্ষিতের জন্য কৃষির খাতে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রতিবন্ধকতা বেশি। কারণ শস্য, মৎস্য ও পশু এই তিনটি ভিন্ন ভিন্ন খাতের ভিন্ন ভিন্ন নিয়মাচার। এখানে বীজ, সার, কীটনাশক, মাছের রেণু, হাঁস-মুরগির বাচ্চা, বাছুর, গাভী, ষাড়- এদের খাবার, ওষুধ ও বাসস্থানের ওপর ভালো জ্ঞান রাখতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ। কৃষি খাতে বিশেষ করে শস্য খাতে কৃষি যন্ত্রপাতির আধুনিকায়ন না হওয়ায় শ্রমিকনির্ভরতা এখানে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। শুধু জ্ঞানে এখানে সফলতা আসে না। এই খাতে গায়ের শক্তির প্রাধান্যই বেশি। তাই অভিজ্ঞতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে;

৭. কৃষি ও ব্যবসায়ের বাজার বুঝতে মাঠ পর্যায়ে নিজে নিজে কাজ শিখতে হবে;

৮. ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করে ঝুঁকির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে;

৯. ছাত্রাবস্থায় দেশের অর্থনীতি বিষয়ে সম্যক ধারণা রাখতে হবে;

১০. কৃষি/ব্যবসায়ের মুনাফা অনুযায়ী মূলধন সংগ্রহের অর্থাৎ ঋণ গ্রহণের বিভিন্ন মাধ্যম বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান রাখতে হবে।

এক কথায় উদ্যোক্তা হতে চাইলে শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় কাজ হবে না। মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণ অবশ্যই থাকতে হবে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। এছাড়া, সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওয়তায় প্রশিক্ষণ নেওয়া যেতে পারে। তবে সব থেকে ভালো প্রশিক্ষণ হবে সচল ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, কৃষি খামার ও কারখানায় শিক্ষানবিশ হিসেবে যুক্ত থেকে প্রশিক্ষণ নিতে পারলে। কাজেই যারা বেকার আছেন, তারা ইউটিউবে মোটিভেশনাল বক্তব্য শুনেই উদ্যোক্তা হতে বিনিয়োগ করে লোকসানে পড়বেন না। মাঠ পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করে প্রশিক্ষণ নিয়ে বা হাতেকলমে শিখে তবেই উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলুন; উত্তম রিজিকের ব্যবস্থা করুন। চাকরিপ্রার্থী না হয়ে স্বাবলম্বী হয়ে আপনি চাকরিদাতা হোন। দেশের অর্থনীতিতে আপনি নিজেকে সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলুন। এছাড়া, যে সকল অভিভাবক তাদের সন্তানদেরকে ব্যবসায়ে প্রতিষ্ঠিত করাতে চাচ্ছেন তারা আগে ওই ব্যবসা সম্পর্কে জানা-বোঝার সুযোগ করে দিন। তারপর বিনিয়োগে উৎসাহিত করুন।

লেখক: যুগ্মপরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক, খুলনা

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)