দিন দিন খুলনায় খুন-খারাবির সংখ্যা বেড়েই চলছে। অপরাধীদের লাগাম টানতে পারছে না পুলিশ। থানাগুলোতে মামলার সংখ্যাও বাড়ছে। বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ডেই অস্ত্র ব্যবহার করছে সন্ত্রাসীরা। হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় খোদ পুলিশ প্রশাসনও উদ্বিগ্ন। এ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখকে উপেক্ষা করে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে একের পর এক খুন করে যাচ্ছে সন্ত্রাসীদের গডফাদাররা।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে খুলনা মহানগরে ২৫টি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। এ সময়ে প্রায় শতাধিক সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলা হয়েছে ২৫টি। হত্যার সঙ্গে জড়িত ১৪ জন ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
একটি সূত্রে জানা যায়, পুলিশের অভিযানে তালিকাভুক্ত অনেক সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা, চাঁদাবাজি ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন মামলা রয়েছে। এরই মধ্যে অনেকে জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। কয়েকজন জেল থেকে বের হওয়ার পর আবারও অপরাধজগতে জড়িয়ে পড়েছেন।
খুন-খারাবিতে কেঁপে উঠছে বুক
দুর্বৃত্তদের অবাধ বিচরণ, খুন-খারাবি ও নৃশংসতার ঘটনায় কেঁপে উঠছে বিবেকবান মানুষের বুক। গত নয় দিনে খুলনায় ছয়টি হত্যাকাণ্ড, অজ্ঞাতনামা নারীর লাশ উদ্ধার এবং দুজনকে হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে।
২০ আগস্ট খুলনার বটিয়াঘাটায় নদী থেকে অজ্ঞাত এক যুবতীর ভাসমান লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ওইদিন দুপুর পৌনে ১টার দিকে বটিয়াঘাটা বাজারসংলগ্ন নদী থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয়।
একই দিন রাতে দিঘলিয়া উপজেলায় বিদ্যালয় ছুটির প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর স্কুলের বাথরুম থেকে হাত-পা ও মুখ বাঁধা অবস্থায় এক ছাত্রীকে উদ্ধার করা হয়েছে। উপজেলার গাজীরহাট হাজী নঈম উদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। উদ্ধার হওয়া ছাত্রী ওই বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে পড়ে।
এর আগের দিন ১৯ আগস্ট শহরের লবণচরায় জোড়া খুন হয়েছে। আশিবিঘা এলাকায় মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে গুলিতে দুই তরুণ নিহত হয়েছেন। ওইদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে মঞ্জুরুল ইসলাম (২২) নামের এক তরুণকে গুলি ও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। রাত সাড়ে ৯টার দিকে একই এলাকায় নাজমুল (১৮) নামের আরেক তরুণের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়।
এর আগে ১৮ আগস্ট রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে নৈহাটীর আলো ফুটবে প্রতিবন্ধী স্কুলের কাছে মামুন মীর (৩৫) নামের এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন। তিনি সংকটজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। একই রাতে নগরীর রায়েরমহল এলাকায় শিশু অপহরণের চেষ্টার অভিযোগে গণপিটুনিতে রাজু (২৬) নামের এক যুবক নিহত হন।
১৫ আগস্ট জয় ঢালী (২৭) নামের এক যুবককে নৃশংসভাবে গলাকেটে ও কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। রূপসা উপজেলার আইচগাতীতে রাত সাড়ে ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। নিহত জয় ঢালী দুর্জনীমহল গ্রামের বাসিন্দা আক্তার ঢালীর ছেলে।
১১ আগস্ট ফখরুল শেখ (৩২) নামের এক যুবককে ইটভাটায় গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। রাত আনুমানিক ১টার দিকে নৈহাটি ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কিসমত খুলনা গ্রামের মেসার্স রূপসা ব্রিকস ইটভাটায় এ ঘটনা ঘটে।
নিহত ফখরুল শেখ নৈহাটি ইউনিয়নের সাত নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা এবং মমিন উদ্দিনের ছেলে। তিনি রূপসা কলেজের সাবেক ছাত্রনেতা এবং বর্তমানে যুবদলের কর্মী হিসেবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
যে কারণে ঘটছে খুনের ঘটনা
খুলনা শহর এখন খুনোখুনির এক ভীতিকর অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। একের পর এক হত্যাকাণ্ড নগরসহ জেলার বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে।
একসময় শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে যাদের নাম উঠে এসেছিল, তারাই এখন আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদার। তাদের অনুসারীরা এখনো নিয়ন্ত্রণ করছে। কেউ বিদেশে বা কারাগারে বসে নিয়ন্ত্রণ করছে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ। যে কারণে মূল আসামিদের ধরা যাচ্ছে না।
অপরাধের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গণঅভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, খুলনায় তা অপরাধীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। বিভিন্ন এলাকার পুরোনো সন্ত্রাসী ও মাদক বিক্রেতারা ফের সক্রিয় হয়েছে। গ্রেনেড বাবুর নেতৃত্বাধীন বি কোম্পানি, পলাশ গ্রুপ, হুমায়ুন কবীরের হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান শেখের আরমান গ্রুপ, শাকিল শেখের শাকিল গ্রুপ ও নাসিমুল গণির নাসিম গ্রুপসহ কিশোর গ্যাংয়ের বেশ কয়েকটি গ্রুপ অপরাধের রাজত্ব কায়েম করছে।
এ ছাড়া পারিবারিক কলহ, সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ ও পূর্বশত্রুতার কারণেও খুলনায় হত্যাকাণ্ড বেড়েছে। যেসব এলাকায় নিম্ন আয়ের ও ভাসমান মানুষের বসবাস বেশি, সেখানেও অপরাধের ঘটনা বেশি।
কেএমপির চলতি বছরের আট মাসের হত্যা মামলার পরিসংখ্যানের নথিতে হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে মাদক ও আধিপত্য বিস্তার, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কারণ, ইজিবাইক চুরি এবং চোর সন্দেহে গণপিটুনির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আইন ও অধিকার বাস্তবায়ন ফোরামের খুলনার সভাপতি এস এম দেলোয়ার হোসেন বলেন, খুলনায় সাম্প্রতিক বেশিরভাগ খুনের ঘটনা ঘটছে মাদক ব্যবসা ও আধিপত্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আগের সিন্ডিকেট ভেঙে যাওয়ায় বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে টার্ফ যুদ্ধ বেড়েছে। খুলনাসহ সারাদেশে খুনের ঘটনায় সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন। এর মূল কারণ রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে সংঘবদ্ধ অপরাধীদের তৎপরতা।
তিনি আরও বলেন, যেভাবে প্রতিটি মহল্লায় মাদকের স্বর্গরাজ্য গড়ে উঠেছে, এটা বন্ধ করতে না পারলে এই খুন বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে আইনের সঠিক প্রয়োগ করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে আতঙ্ক
আইনশৃঙ্খলার অবনতির ফলে খুলনায় প্রায় প্রতিদিনই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সর্বকালের সবচেয়ে নিম্ন পর্যায়ে অবস্থান করছে। এ নিয়ে সবার মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাগরিক নেতারাও।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, খুলনায় জামিনে মুক্তি পেয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসীরা। আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটছে। ক্রমেই বাড়ছে খুনের ঘটনা। বাড়ছে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইসহ নানা অপরাধ। সর্বত্রই চলছে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখলযজ্ঞ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা কমে যাওয়ার কারণে সন্ত্রাসীরা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। অপরাধ দমনে বিভিন্ন থানা পুলিশের মনোযোগেও ভাটা পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, চলমান সংকট উত্তরণের জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও কঠোর হতে হবে। নিজ নিজ এলাকায় পুলিশি টহল বৃদ্ধি করতে হবে। অপরাধীদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আরও বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে। কোনো ঘটনা ঘটলে সঠিক তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে চার্জশিট দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এমনভাবে চার্জশিট উপস্থাপন করতে হবে, যাতে কোনো আসামি ছাড় না পায়।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদ করে চিরুনি অভিযানের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। এ ছাড়া নিষ্ক্রিয় পুলিশ কর্মকর্তাদের সরিয়ে যোগ্যদের দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে সামনের দিনগুলোতে সহিংসতা আরও বেড়ে যাবে।
পুলিশ কর্মকর্তারা যা বলছেন
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এম এম শাকিলুজ্জামান বলেন, আমরা অপরাধী ধরতে চেষ্টা করছি। আপনারা পরিসংখ্যান দেখলেই বুঝতে পারবেন, আমাদের কর্মকাণ্ড কীভাবে চলছে। আমরা অপরাধীকে ধরছি, কিন্তু তারা জামিনে বের হয়ে যাচ্ছে। আবার তারা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, পুলিশ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে। কিন্তু ঘরের ভেতর অপরাধ হলে পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করবে কীভাবে, এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণের টোটকা পুলিশের জানা নেই। আপনারা দেখেছেন, কিছুদিন আগে একটি মেয়েকে তার বাবা-মা মেরে ফেলেছে। আমরা কিন্তু এটি উদঘাটন করেছি।
কীভাবে অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করা যায়, এমন প্রশ্নের জবাবে শাকিলুজ্জামান বলেন, অপরাধ দমনে সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন। কিন্তু মানুষ সেটা করছে না। আমি আশা করি, খুলনার মানুষ সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে এগিয়ে আসবেন এবং আমাদের সাহায্য করবেন। এতে অপরাধীদের অপরাধপ্রবণতা কমে আসবে।
খুলনার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, মানুষ যদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার উন্নতি হবে। সব ঘটনায় শুধু পুলিশকে দায়ী করলে হবে না। সমাজব্যবস্থার উন্নতির দায়িত্ব আমাদের সবার। মাদক কার্যক্রম দমনে সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
কীভাবে কমবে অপরাধপ্রবণতা
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ সামিউল হক বলেন, খুলনা শহরে খুন যেন সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে গেছে বিভৎস, বিকৃত ও রোমহর্ষক খুনের ঘটনা। একসময়ের শান্তির নগরী বলে খ্যাত খুলনা এখন রূপ নিয়েছে মৃত্যুপুরীতে। হত্যাকাণ্ড এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
কেন বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা, এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক সামিউল হক বলেন, নৈতিক অবক্ষয়, কিশোর গ্যাং, স্থানীয় আধিপত্যের লড়াই, মাদক ও পরকীয়া, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের বিরোধ, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক শত্রুতা-সবকিছু মিলেই হত্যার ঘটনাগুলো ঘটছে। এর সঙ্গে নতুন উদ্বেগ হিসেবে যুক্ত হয়েছে পেশাদার অপরাধী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয়তা।
কীভাবে অপরাধপ্রবণতা কমবে, এমন প্রশ্নের জবাবে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলেন, বিগত দিনে যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেগুলোর সঠিক বিচার হলে এবং অপরাধীরা উপযুক্ত শাস্তি পেলে অপরাধের মাত্রা কমে আসবে। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অপরাধীদের ধরতে আরও তৎপর হতে হবে। চালাতে হবে সাঁড়াশি অভিযান।
পাশাপাশি একটা বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে সবাইকে। সেটি হচ্ছে, আমরা আমাদের সন্তানদের পরীক্ষায় যাতে ভালো ফল করে, সেদিকেই ছুটছি। এরপর তাদের ভালো চাকরির জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছি। সেভাবেই তাদের গড়ে তুলছি। কিন্তু কীভাবে ভালো মানুষ হতে হয়, সে শিক্ষা সমাজে আমরা কজনই বা দিতে পারছি? অ্যাকাডেমিক শিক্ষার বাইরেও মানবিক, নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা কজনই বা দিচ্ছি?