খুলনা অফিস
চলতি বছরে খুলনা জেলায় ৩৫টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন হলেও দশটি এখনো অনুদ্ঘাটিত। এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে গুলি করে টার্গেট কিলিং হয়েছে নয়টি। পুলিশের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গুলি করে হত্যার ঘটনাগুলোর পেছনেও মূলত মাদককেন্দ্রিক বিরোধ রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের এই পরিসংখ্যান এবং সাম্প্রতিক টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনায় উদ্বেগের মধ্যে খুলনা জেলা পুলিশ মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে।
মঙ্গলবার রাত থেকে শুরু হওয়া এ অভিযানে বুধবার পর্যন্ত ৯৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ অনলাইন জুয়া ও মাদকের সঙ্গে জড়িত বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের অভিযানসংক্রান্ত তথ্য অপরাধীদের কাছে পাচারকারী কয়েকজন ‘ওয়াচারকেও’ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযানে ২৫০ পিস ইয়াবা ও এক কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে।
বুধবার বিকেলে খুলনা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে মাদককে কেন্দ্র করে তিনটি, সামাজিক দ্বন্দ্ব বা মারামারিতে ১৩টি, রাজনৈতিক গ্রুপিংয়ে দুটি, অজ্ঞাত কারণে দুটি এবং শ্বাসরোধে নবজাতক হত্যা দুটি। এ ছাড়া পারিবারিক বা পরকীয়াজনিত কারণে আরও চারটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। গুলি করে টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ঘটেছে নয়টি।
হত্যাকাণ্ডের সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে রূপসাকে চিহ্নিত করেছে জেলা পুলিশ। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ উপজেলায় ১২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সর্বশেষ দুটি টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনায় জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এ পরিস্থিতিতে রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা-এই চার থানাকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ধরে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টা চেকিং, ব্লক রেইড ও দৃশ্যমান পুলিশি উপস্থিতি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নড়াইল ও যশোরসহ অন্য জেলা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ এনে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে চান তিনি। অপরাধীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘মাদক ও অবৈধ অস্ত্র নিয়ে এলাকায় কোনো কাজ করা যাবে না।’
পুলিশ সুপার বলেন, মাদক ও অবৈধ অস্ত্র পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে লাভের ভাগাভাগি ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব থেকে হত্যাকাণ্ডের একটি অংশ ঘটছে। একই সঙ্গে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তারও হত্যাকাণ্ড বাড়াচ্ছে। এ কারণে বিশেষ অভিযানে মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রূপসাকে অপরাধের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে ভৌগোলিক ও জনবসতিগত বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। খুলনা শহরের কাছাকাছি হলেও রূপসা নদীর কারণে এ অঞ্চল শহর থেকে বিচ্ছিন্ন। অপরাধ করে নদীপথে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ঘনবসতি, অসংখ্য সরু গলি ও শাখা-প্রশাখা সড়ক অপরাধীদের আত্মগোপন এবং দ্রুত স্থান পরিবর্তনে সহায়তা করে বলে পুলিশের ধারণা।
পুলিশের ভাষ্য, গত কয়েক বছরে বাসাবাড়ির ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংরক্ষণেও বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে পাশের বাড়িতে কে থাকছে, সে তথ্যও অনেক সময় পুলিশের কাছে থাকছে না। অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে সিসিটিভি স্থাপনে জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছে পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে নিরাপত্তা চেয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরও রূপসায় এক ব্যক্তির হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন, ওই ঘটনায় ‘সেনসিটিভিটি’ যথাযথভাবে মোকাবিলা করা যায়নি। প্রাথমিক তদন্তে যাদের নাম এসেছে, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
পুলিশ সুপার জানান, ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে নিয়মিত অভিযান চললেও এখন পর্যন্ত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তার ভাষায়, আগের অভিযান যথেষ্ট তীব্র ছিল না। এবার কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘এবার চেকিং ও দৃশ্যমান পুলিশি উপস্থিতি ২৪/৭ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। মাদক স্পট, সন্ত্রাসীদের সম্ভাব্য আস্তানা ও চাঁদাবাজদের এলাকায় অভিযান চলবে।’
আগের একক প্রচেষ্টায় প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় এবার কেএমপি, জেলা পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ে সমন্বিত অভিযান চালানো হচ্ছে বলেও জানান পুলিশ সুপার। দুর্গাপূজা নির্বিঘ্ন করা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনাও এ অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য। রাজনৈতিক কোনো অনুরোধে অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।