আসাদুজ্জামান সরদার
, সাতক্ষীরা
যাদের হাত ধরে সংসারে সচ্ছলতা ফেরার কথা ছিল, তাদের নিথর দেহের অপেক্ষায় এখন প্রহর গুণছে সাতক্ষীরার দুটি গ্রাম।
লেবাননের নাবাতিয়েহ এলাকায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন সদর উপজেলার শফিকুল ইসলাম ও আশাশুনির নাহিদুল ইসলাম।
ঋণের বোঝা আর সুন্দর আগামীর স্বপ্ন নিয়ে দেশান্তরী হওয়া এই দুই প্রবাসীর জীবন প্রদীপ নিভে গেছে পরবাসে। তাদের এই অকাল মৃত্যুতে শুধু দুটি পরিবারই নয়, স্তব্ধ হয়ে গেছে গোটা এলাকা, শোকের ছায়া নেমে এসেছে।স্বজন হারানোদের আহাজারিতে বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে।
লেবাননের নাবাতিয়েহ এলাকার জেবদিন গ্রামে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন এই দুই বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধা। অভাবের সংসারে সচ্ছলতা আনতে যারা কয়েক সপ্তাহ আগে ভিটেমাটি আর ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন পরবাসে, সেখানে ফলের দোকানে কাজ করতেন। আজ তাদের মৃত্যুর খবর এলাকায় এনে দিয়েছে নীরবতা।
শফিকুলের ঘরে দুই মেয়ের কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। কোনো সান্ত্বনায় তাদের থামানো যাচ্ছে না। তার বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, শোকের মাতম।
শফিকুলের স্ত্রী রুমা খাতুন যেনো পাথর হয়ে গেছেন। কিছুক্ষণ পর পর জ্ঞান হারাচ্ছেন, আর জ্ঞান ফিরলেই বিলাপ করে বলছেন, ‘ওগো, তুমি কেন আমাদের একা ফেলে চলে গেলে? মেয়ে দুটোর কী হবে? কার কাছে ওরা বাবার আবদার করবে...?"
রুমা খাতুন বলেন, দশ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশ যায় শফিকুল। এখন সুদে-আসলে সেই ঋণের অংক প্রায় ১২ লাখে ঠেকেছে। কীভাবে এই ঋণ শোধ হবে আর কীভাবে দুই মেয়ের লেখাপড়া চালাবেন, কীভাবে চলবে সংসার? এভাবে বিলাপ করতে করতে মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি।
শফিকুলের বড় মেয়ে তামান্না আক্তার মৌ এবার এইচএসসি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। বাবার স্বপ্ন ছিল মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবেন। বাবার সেই স্বপ্নের কথা মনে করে মৌ ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। ‘বাবা তো বলেছিল ঈদে আমাদের জন্য নতুন জামা পাঠাবে। এখন বাবার বদলে লাশ আসবে কেন? আমি এখন কাকে বাবা বলে ডাকব?’- বিলাপ করছিল মৌ।
পাশেই বসে কাঁদছে ছোট মেয়ে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তন্নি আক্তার বৃষ্টি। বাবার অভাব বুঝতে শেখার আগেই সে আজ এতিম। বৃষ্টির কান্নায় প্রতিবেশী মহিলারাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না। শফিকুলের মা মাটিতে আছাড়ি-পাছাড়ি করছেন। তার বিলাপ যেন থামছেই না। শফিকুলের প্রতিবেশী ও স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক আল কালাম আবু ওয়াহিদ বলছিলেন, শফিকুল ছিল পরিবারের একমাত্র আশার আলো। গত ২০ রমজান অনেক স্বপ্ন নিয়ে সে বিদেশে গিয়েছিল। এখনো এক মাসও পূর্ণ হয়নি, এর মধ্যেই সব শেষ।
ধুলিহর ইউপি সদস্য ফারুক হোসেন মিঠু বলেন, শফিকুল অনেক পরিশ্রমী ছেলে ছিল। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে সে লেবানন গিয়েছিল পরিবারের সুদিন ফেরানোর লড়াই শুরু করতে। কিন্তু লড়াই শুরু হওয়ার আগেই ঘাতক ড্রোনের আঘাতে সব চূর্ণ হয়ে গেল।
লেবাননের স্থানীয় সময় সোমবার দুপুর। বৈরুতের বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, নাবাতিয়েহ প্রদেশের জেবদিন গ্রামের একটি আবাসিক বাড়িতে অতর্কিত ড্রোন হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। ওই বাড়িতেই থাকতেন সাতক্ষীরার শফিকুল ইসলাম (৩৮) এবং নাহিদুল ইসলাম (২৬)। হামলায় ধসে পড়া বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন তারা। ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় শফিকুল ও নাহিদুল ছাড়াও একজন সিরিয় নাগরিক নিহত হয়েছেন।
এর কিছুক্ষণ আগেই ওই এলাকার একটি রুটি বহনকারী ভ্যানে ড্রোন হামলায় আরও দুই স্থানীয় বাসিন্দা প্রাণ হারান। অর্থাৎ, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ওই এলাকা দ্বিতীয় দফা হামলার শিকার হয়। বর্তমানে দুই বাংলাদেশির মরদেহ নাবাতিয়েহর নাবিহ বেররী হাসপাতালে রাখা হয়েছে।
নাহিদুলের বাড়িতেও চলছে স্বজনদের আহাজারি। আশাশুনির কাদাকাটি গ্রামের আব্দুল কাদেরের ছেলে নাহিদুল ইসলাম। মাত্র ২৬ বছর বয়সেই সংসারের হাল ধরতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন তিনি। বাবা-মায়ের দুই সন্তানের মধ্যে নাহিদ ছিলেন বড়। নাহিদুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় স্বজনদের উপচে পড়া ভিড়। মা বিলাপ করতে করতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। তিনি বিড়বিড় করে বলছেন, ‘বাবা রে, তুই তো বললি ভালো আছিস, কয়েক দিন পর টাকা পাঠাবি। এখন তোর লাশ আসছে কেনরে..’
নাহিদুলের বাবা আব্দুল কাদের নির্বাক হয়ে বসে আছেন, তার দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল। দরিদ্র পরিবারে সচ্ছলতা আনতে চড়া সুদে ঋণ করে তাকে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল, সেই ঋণের কথা মনে করে স্বজনরা আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন।
ধুলিহর ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন, এই দুটি পরিবার অত্যন্ত অসহায়। ঋণ করে সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়েছিলেন তারা। শফিকুলের মেয়ে দুটি এখন পড়াশোনা করবে কীভাবে? পরিবার দুটি এখন অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে গেছে। ঋণের টাকা কে শোধ করবে, আর এই এতিম সন্তানদের কে দেখবে!
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত বলেন, নিহতদের পরিবারের সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। মরদেহ দেশে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।