'সাইফুল বাহিনীর' দাপটে
দুই কোটি টাকার সম্পত্তি ঘিরে মামলা-হামলা-আতঙ্ক
শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি
সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া ইউনিয়নের পূর্ব বিড়ালাক্ষী এলাকায় প্রায় নয় একর জমি দখলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইউনিয়ন কৃষক লীগের সাবেক সভাপতি সাইফুল ঢালি রাজনৈতিক প্রভাব, ভয়ভীতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের জমি বছরের পর বছর দখলে রেখেছেন। এলাকাজুড়ে ‘সাইফুল বাহিনী’ নামে পরিচিত একটি গ্রুপের মাধ্যমে জমির প্রকৃত মালিকদের দমন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
শুক্রবার (২২মে) সরেজমিন স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্যমতে, পূর্ব বিড়ালাক্ষী মৌজার এসএ ৬২ নম্বর খতিয়ানের জমিটি ১৯৯০ সাল থেকে সুন্দর ঢালির মালিকানাধীন ছিল। পরবর্তীতে জমিটি খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হলে বন্দোবস্তের মাধ্যমে মোকাম শেখ ও গহুর খাঁর নামে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। পরে নামজারি, রেকর্ড সংশোধন ও বিভিন্ন দলিলের মাধ্যমে ভাদ্র বিবির উত্তরাধিকার সূত্রে বর্তমান বাদীপক্ষ জমির মালিক হন। চলমান জরিপেও জমি তাদের নাম সরকারি নথিতে রয়েছে বলে জানান।
তবে অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সাইফুল ঢালি ওই জমি জোরপূর্বক দখলে নেন। জমির একাংশে ঘরবাড়ি নির্মাণ করেন। পাশাপাশি সেখানে চিংড়ি ঘেরও করেন।
স্থানীয়দের দাবি, সাইফুল ঢালি তার পরিবারের সদস্য ও অনুসারীদের নিয়ে প্রায় ২০ জনের একটি শক্তিশালী বাহিনী গড়ে তুলেছেন। ‘সাইফুল বাহিনী’ নামে পরিচিত এই গ্রুপটি এলাকায় মাদক কেনাবেচা, প্রভাব বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং দখল বজায় রাখতে সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগী কুদ্দুস শেখ বলেন,আওয়ামী লীগের আমলে আমরা ওই জায়গায় যেতে গেলে আমাদের দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দিত। আমাদের নামে মিথ্যা মামলা দেওয়ার ভয় দেখানো হতো। এ নিয়ে ওই সময় আমরা আতঙ্কের মধ্যে জীবন কাটিয়েছি।
আরেক ভুক্তভোগী আব্দুস সামাদ বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে তো জমির ওপর যেতেই পারিনি। ৫ আগস্টের পরে আমরা আবার ওই জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু ওদের কিছু মাদকাসক্ত লোকজন আমাদের ওপর হামলা চালায়।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গত দেড় দশকে জমির মালিকরা বারবার নিজেদের রেকর্ডভুক্ত সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করলেও প্রতিবারই হামলা, মামলা ও হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক গায়েবি ও নাশকতার মামলা দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে অনেকে কারাবরণ করেছেন বলেও জানান তারা।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় এক ধরনের ‘অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ’ তৈরি করা হয়েছিল। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে নানা উপায়ে চুপ করিয়ে দেওয়া হতো।
গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে জমির প্রকৃত মালিক দাবি করা পরিবারগুলো নতুন করে আশাবাদী হয়ে ওঠেন। তারা আবার জমিতে প্রবেশ ও দখল ফিরে পাওয়ার চেষ্টা শুরু করেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, এখনও সাইফুল ঢালি ও তার অনুসারীরা এলাকায় সক্রিয় রয়েছেন এবং দখল ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
সম্প্রতি কয়েকবার জমিতে প্রবেশকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনায় কয়েকজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন বলেও জানা গেছে। যদিও এ ঘটনায় থানায় মামলা কিংবা লিখিত অভিযোগের বিষয়ে নিশ্চিত কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাইফুল ঢালির বলেন, আমি এস এ, সি এস, আর এস এই তিন রেকর্ডের মালিক এবং আমার বাবার নামে কওলা যার নাম্বার ১১১০ ও ১৯৪০ সাল, ওরা যেটা বলছে ওটা ভূয়া। ওদের নামে হামলা ও মামলা দেওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত হিসেবে তাদেরকে কোনপ্রকার হয়রানিও করা হয়নি।
এ বিষয়ে আটুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আবু সালেহ বাবু বলেন এ বিষয়ে আমাকে কেউ জানায়নি, আমি কোনকিছুই অবগত না।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য শ্যামনগর উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি কে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই জমি বিরোধ এখন কেবল সম্পত্তি দখলের অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এটি রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং গ্রামীণ জনপদে বিচারহীনতার সংস্কৃতির এক ভয়ংকর উদাহরণ হয়ে উঠেছে।