যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

উচ্ছেদ অভিযানের নেপথ্যে এক কর্মকর্তার ঘুসের কারবার!

রায়হান সিদ্দিক

, যশোর

প্রকাশ : সোমবার, ২৫ মে,২০২৬, ১০:০০ এ এম
আপডেট : রবিবার, ২৪ মে,২০২৬, ১১:১৬ পিএম
উচ্ছেদ অভিযানের নেপথ্যে এক কর্মকর্তার ঘুসের কারবার!

যশোর নূতন উপশহর এলাকায় সম্প্রতি হাউজিং এস্টেট কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদ অভিযান চালায়। সরকারি জমিতে কেউ অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ করে বসবাস বা ব্যবসা পরিচালনা করলে তাকে উচ্ছেদ করা হবে- এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু অভিযোগ করা হচ্ছে, হাউজিং এস্টেটের এক কর্মকর্তাকে চাহিদানুযায়ী ঘুস দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এবারের উচ্ছেদ অভিযানটি সুপরিকল্পিতভাবে নির্ধারিত ব্যক্তিদের সম্পদের ওপর চালানো হয়। ওই কর্মকর্তার ঘুসবাণিজ্যের বিষয়ে দুদকের গণশুনানিতেও অভিযোগ করা হয়েছিল। সেটিও তার ক্ষিপ্ত হওয়ার অন্যতম কারণ বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। অবশ্য অনেক চেষ্টা করেও অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য জানা যায়নি।

হাউজিং এস্টেট সূত্র জানায়, উচ্ছেদ অভিযানের পর থেকে ওই কর্মকর্তা অনেকটা লুকোচুরি খেলছেন। তিনি অফিসে আসেন ঠিকই, কিন্তু কখন বেরিয়ে যান, তা কেউ জানেন না। সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি টের পেলে তিনি ভিন্ন পথ দিয়ে অফিস ত্যাগ করেন। ভিন্ন একটি বিষয়ে বক্তব্য আনতে গিয়ে সুবর্ণভূমির আরেকজন প্রতিবেদকও বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইমাদুল ইসলাম তুহিন নামে এক ব্যক্তি ২০১৫ সালে যশোর হাউজিং এস্টেটের উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেছিলেন। ২০১৮ সালে তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এস্টেট) হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পান। ২০২২ সালে তাকে বগুড়ায় বদলি করা হয়। কিন্তু এর কয়েক মাসের মাথায় ইমাদুল ইসলাম তুহিন ২০২৩ সালে যশোরে ফিরে আসেন। দীর্ঘসময় ধরে দায়িত্বে থাকার সুবাদে এলাকার বাসিন্দাদের সাথে তার সখ্য গড়ে ওঠে। সেই সুযোগে জমিগুলো স্থায়ী দলিল করার নামে ঘুস দাবি করেন তুহিন।

ভুক্তভোগীরা জানান, স্থায়ী দলিলের জন্য কয়েক দফায় ইমাদুল ইসলাম তুহিনকে টাকা দিয়েছেন তারা। কিন্তু কাজ না করে উল্টো আরো টাকা দাবি করতে থাকেন তিনি। আর সেই টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোতেই উচ্ছেদের শিকার হয় পরিবারগুলো।

এ বিষয়ে পুতুল নামে এক ভুক্তভোগী নারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘প্রশাসনিক কর্মকর্তা তুহিন বহুবার আমার কাছে টাকা চেয়েছে, কিন্তু আমি টাকা দিতে পারিনি। উনি আমাকে বলেছিলেন ‘আমাকে ৩০ লাখ টাকা দাও, আমি নাজমুন নাহার মুক্তির সাথে একটা আঁতাত করে দিচ্ছি। এখানে তো জন্মসূত্রে ১৯৫২ সাল থেকে তোমরাই থাকো, দখলে তো ওরা কখনোই আসতে পারেনি। সেজন্য তুমি আমাকে কিছু টাকা দাও, আমি তোমার নামে করে দিচ্ছি।’ মূলত এটি কোনো উচ্ছেদ না, এটি তাদের একটি পূর্বপরিকল্পিত চাল।”

দুদকের গণশুনানিতে অভিযোগ করায় ক্ষিপ্ত হয়ে এই উচ্ছেদ চালানো হয়েছে দাবি করে মাহফুজ হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘তুহিন আমার কাছে ২২ লাখ টাকা চেয়েছিল। সেই টাকা না দিয়ে সম্প্রতি দুদকের একটি গণশুনানিতে আমি উনার নামে দরখাস্ত করি। সেখানেও উনার সাথে আমি ফাইট করেছি। এই কারণে উনি বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে গেছেন। এই উচ্ছেদটা শুধু যে অবৈধভাবে হয়েছে তা নয়, এর পাশাপাশি সেখানে ডাকাতিও হয়েছে। যারা উচ্ছেদ করতে এসেছিল, তারা সবাই মাস্ক পরে এসেছিল।’

তার মতে, সামনে দিয়ে বুলডোজার যাওয়ার সুযোগ না থাকায় পেছন দিক দিয়ে গুন্ডাবাহিনী পাঠিয়ে সিসি ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়। বাসা থেকে পাঁচ ভরি সোনার গয়না, নগদ দুই লাখ টাকা এবং জমির সব দলিলপত্র তারা নিয়ে গেছে। তাদের উদ্দেশ্যই ছিল লুণ্ঠন করা।

ঝন্টু নামে আরেক বাসিন্দা লোন তুলে ঘুস দেওয়ার বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘সরকার পরিবর্তনের পর আমাদের জমি স্থায়ী করে দেওয়ার কথা বলে তুহিন প্রথম আমাদের কাছ থেকে এক লাখ টাকা করে নেয়। এভাবে ২৭টি ফ্যামিলির কাছ থেকে ২৭ লাখ টাকা নিয়েছে। লোন তুলে নগদ ২৭ লাখ টাকা আমরা তার হাতে তুলে দিয়েছিলাম।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইমাদুল ইসলাম তুহিনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে অফিসে পাওয়া হয়নি। কয়েক দফায় ফোন ও মোবাইলে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও মেলেনি কোনো সাড়া।

তবে অভিযানের দায়িত্বে থাকা জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের খুলনা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউর রহমানের দাবি, অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়নি, সকল নিয়ম মেনেই এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে।

বিভাগীয় নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউর রহমান বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন গ্রহণ করে, অনেক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই করেই এই অভিযান করা হয়। সেক্ষেত্রে একজন ফিল্ড অফিসারের এখানে কোনো এখতিয়ার নাই যে, তিনি চাইলে যে কাউকে উচ্ছেদ করতে পারেন বা উচ্ছেদের তালিকায় আনতে পারেন। এখানে যে সকল অবৈধ সম্পত্তি আছে সেগুলোকে আমরা উচ্ছেদ করেছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মামলা চলমান থাকা অবস্থায় উচ্ছেদ করা যাবে না এরকম নীতিগত কোনো সিদ্ধান্ত বা নিয়ম নাই।

এদিকে, ভুক্তভোগীদের অভিযোগ পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন যশোর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান।

তিনি বলেন, ‘বেশ কিছু অভিযোগকারী আমার কাছে এসে লিখিত আবেদন করে গেছেন। আমরা সেই আবেদনগুলো পর্যালোচনা করে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মহোদয়ের কাছে পাঠিয়ে দেবো। উচ্ছেদ অভিযানে অনেকের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া, আদালতের রায় থাকা সত্ত্বেও উচ্ছেদ করা, এসএসসি পরীক্ষা চলাকালীন সময় না দেওয়া কিংবা আসবাবপত্রের ক্ষতি করার যে বিষয়গুলো নিয়ে আমরা আবেদন পেয়েছি সেগুলো সব চেয়ারম্যান মহোদয় আইনগতভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করবেন এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে তিনি ব্যবস্থা নিতে পারবেন।’

গত ১০ ও ১১ মে যশোরের উপশহর, বাবলতলা, নিউ মার্কেট এবং ঢাকা রোড এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালায় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। দুই দিনে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় চার শতাধিক স্থাপনা। উদ্ধার করা হয় পাঁচ একর জমি, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা বলে কর্তৃপক্ষের দাবি।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)