খুলনা অফিস
ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট নিয়ে খুলনায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত এ বিশাল বাজেট ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মিশ্র মতামত জানিয়েছেন খুলনার বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, জুলাইযোদ্ধা ও ব্যবসায়ী নেতারা।
প্রস্তাবিত বাজেটের বৃহৎ আকার ও উন্নয়ন পরিকল্পনাকে এক পক্ষ স্বাগত জানালেও তা বাস্তবায়নে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অপর পক্ষ।
বাজেটকে ‘গণমুখী, উন্নয়নমুখী ও জনবান্ধব’ আখ্যা দিয়ে দিয়েছেন খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনা।
এই বাজেটকে 'জীবন ও জীবিকা বাঁচানোর আত্মনির্ভরশীল বাজেট' হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জীবন ও জীবিকাকে প্রাধান্য দিয়ে একটি বাস্তবভিত্তিক সময়োপযোগী বাজেট দিয়েছে সরকার। গণমুখী এ বাজেট দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে ধন্যবান জানিয়েছেন তিনি।
অপরদিকে, প্রস্তাবিত বাজেট নিঃসন্দেহে ঋণ নির্ভর বলে মন্তব্য করেছেন খুলনা মহানগর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, নিজস্ব সম্পত্তি দিয়ে এই বাজেট বাস্তবায়ন করা খুবই কঠিন হবে।
খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ তারিকুল ইসলাম বলেন, দেশের ইতিহাসের ৫৫ তম বাজেট আকারে যেমন বড় নিশ্চয়ই বাজেট বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জও তেমনি অনেক বেশী। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দা, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ এক্ষেত্রে বাড়তি চাপ তারমধ্যে দীর্ঘদিন পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের ইস্তেহার বাস্তবায়ন এগুলো প্রোপারলি এড্রেস করা সত্যিই দুঃসাধ্য। সরকারের আন্তরিক দক্ষতা, দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা এবং নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারলে সফল হওয়া অসম্ভব নয়।
তার মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও বিনিয়োগে প্রত্যাশিত গতি আনয়ন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো আরো অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি যথাযথভাবে সম্প্রসারণ ও বাস্তবায়ন এবং কর্মসংস্থানের বিস্তৃতি এগুলো অগ্রাধিকার পেলে নিশ্চয়ই সুফল পাওয়া যাবে। ষাটোর্ধ্ব নাগরিকদের জন্য ট্রেন যাত্রা ফ্রি ও মেট্রোরেলে ২৫% ছাড় একটা চমৎকার ইস্যু বলে মন্তব্য করেন এই শিক্ষাবিদ।
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তরিকুল ইসলাম জহির বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট এটি। ঘোষিত বাজেটে বেশ কিছু ভালো দিক রয়েছে। আশাকরি বাজেট ব্যবসাবান্ধব হবে। তবে বিশাল এ বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে।
বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের খুলনা বিভাগীয় প্রধান অ্যাডভোকেট শামীমা সুলতানা শিলু বলেন, এই বাজেট তৃণমূল পর্যায়ের নারী উদ্যোক্তাদের সার্বিক উন্নয়নের জন্য সঠিক ও বাস্তব মুখী হয়েছে। আশা করছি এ বাজেট বাস্তবায়ন হলে নারী উদ্যোক্তাদের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটবে।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, বাজেটে চিকিৎসা খাতসহ কিছু ইতিবাচক দিক আছে বটে, তবে সামগ্রিক বাজেট অনেকটাই স্বপ্নবিলাসী বা উচ্চ বিলাসী বলেই মনে হচ্ছে। বিশাল অংকের ঋণ পরিশোধের বোঝা এবং রেকর্ড পরিমাণ ঘাটতি বাজেট মাথায় নিয়ে পূণরায় সিংহভাগ ঋণনির্ভর বাজেট কতটা ফলপ্রসূ হবে, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়।
তিনি বলেন, বাজেটে দেশের ৯৯শতাংশ মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। কিছু চটকদার এবং ইনোভেটিভ শব্দ ছাড়া বাকিটা গতানুগতিক বাজেট বলেই মনে হচ্ছে। কর আরোপের বিষয়ে উচ্চবিত্ত বা স্বচ্ছল ব্যক্তিদেরকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। বিলাসী পণ্যের কর হ্রাস করে ধনিক শ্রেণির স্বার্থ সংরক্ষণ করা হয়েছে। প্রত্যক্ষ করের পরিবর্তে পরোক্ষ করের প্রতি বেশী জোর দিয়ে নিত্যপ্রয়োনীয় দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিকে উৎসাহিত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শিল্প উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টি উপেক্ষিতই রয়ে গেল। যার সাথে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং জিডিপি'র বিষয়টি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।
অবাস্তবসম্মত এ বাজেটে মুদ্রাস্ফীতির আশংকা আরো বেড়ে গেল। আইনশৃংখলা পরিস্থতির উন্নতিতে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি কিংবা যুগোপযোগী করার স্পষ্ট কোনো ধারণা এ বাজেটে নেই। অথচ দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য-অর্থনীতি গতিশীল করতে হলে আইনশৃংখলা পরিস্থিতির উন্নতি বা স্থিতিশীলতার কোনো বিকল্প নেই। এটি নির্বাচিত একটি নতুন সরকার হিসেবে আশার সঞ্চার করতে তো পারেইনি বরং প্রত্যাশা পূরণের বিপরীতে অনেকটাই হতাশাব্যঞ্জক বলেই আমার অভিমত।
এনসিপির খুলনা মহানগর সংগঠক আহম্মদ হামীম রাহাত বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বিশাল বাজেট চলমান বৈশ্বিক মন্দা এবং অভ্যন্তরীণ তীব্র মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় এক বড় পরীক্ষা। শিক্ষা খাতে রেকর্ড ১.৩৬ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং উচ্চশিক্ষায় ঋণের মতো কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এর সফল বাস্তবায়ন নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে, বাজেটের ২.৪৩ লাখ কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি মেটাতে সরকার যদি ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তবে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে গিয়ে কর্মসংস্থান মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।
তিনি আরও বলেন, বাজারে নিত্যপণ্যের দাম যখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, তখন মূল্যস্ফীতি ৭.৫%-এ নামিয়ে আনার কোনো সুনির্দিষ্ট বা কার্যকর রোডম্যাপ এই বাজেটে অনুপস্থিত। এছাড়া শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়লেও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, শিক্ষকদের বেতনবৈষম্য দূরীকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি রোধের কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এখানে দেওয়া হয়নি। বাস্তবমুখী কর্মসংস্থান নিশ্চিত না করে কেবল উচ্চশিক্ষায় ঋণের চটকদার ব্যবস্থা তরুণ সমাজকে দীর্ঘমেয়াদে আরও ঋণগ্রস্ত ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আর্থিক খাতের লুটপাট বন্ধ, অর্থ পাচার রোধ কিংবা খেলাপি ঋণ আদায়ের মতো জরুরি সংস্কারের বিষয়ে এই বাজেটে এক প্রকার নীরবতা পালন করা হয়েছে। তাই বলা যায়, এই বাজেটের লক্ষ্য ও পরিকল্পনাগুলো কাগজে-কলমে সময়োপযোগী মনে হলেও, সুশাসন ও আমলাতান্ত্রিক অপচয় রোধ করতে না পারলে এটি অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে বা শিক্ষা খাতে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে পুরোপুরি ব্যর্থ হবে।
পুলিশের গুলিতে চোখ হারানো জুলাইযোদ্ধা খুলনার আব্দুল্লাহ শাফিল বলেন, বাজেটের ইতিবাচক উদ্যোগের পূর্ণতা চাই বাস্তবায়নে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। নতুন উপকারভোগী অন্তর্ভুক্তি, ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি এবং প্রথমবারের মতো জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য মাসিক সম্মানী ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি দায়িত্ববোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। বিশেষ করে গুরুতর আহতদের জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতার সমপরিমাণ মাসিক সহায়তা তাদের হারানো কর্মক্ষমতা ও অঙ্গহানিজনিত অপূরণীয় ক্ষতির কিছুটা হলেও লাঘবে সহায়ক হবে। তবে এই উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।
তিনি আরও বলেন, জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনকে কার্যকর ও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং শহীদ ও আহতদের কল্যাণে দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে প্রয়োজনীয় আর্থিক ও প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়া জরুরি।