খুবি প্রতিনিধি
সুন্দরী গাছের ভেতরের উপকারী ও ক্ষতিকর ছত্রাকের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া টপ ডাইং রোগ (স্থানীয় ভাবে আগামরা রোগ নামে পরিচিত) বিস্তারের অন্যতম কারণ হতে পারে। এতদিন রোগটিকে মূলত পরিবেশগত চাপের ফল হিসেবে দেখা হলেও নতুন গবেষণায় গাছের অভ্যন্তরীণ জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তনকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) গবেষকরা।
বুধবার (১৩ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ইন্টিগ্রেটেড স্টাডিজ অন দ্য সুন্দরবনস অ্যান্ড কোস্টাল ইকোসিস্টেমস (আইআইএসএসসিই)-এর উদ্যোগে 'দ্য হিডেন কজ অব সুন্দরী ডিক্লাইন: আ নিউ ফাঙ্গাল পার্সপেক্টিভ ' শীর্ষক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে সুন্দরী গাছের আগামরা রোগের নতুন কারণ নিয়ে গবেষণা তথ্য তুলে ধরা ধরেছে।
সেমিনারে টেকনিক্যাল সেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকল্পের প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর ও আইআইএসএসসিই'র সায়েন্টিফিক অফিসার অন্তি ইসলাম। তিনি সুন্দরবনের সুন্দরী গাছের আগামরা রোগের নতুন ছত্রাকজনিত কারণ, রোগ বিস্তারের প্রক্রিয়া এবং তা মোকাবিলায় সম্ভাব্য গবেষণা ও করণীয় বিষয়ে গবেষণালব্ধ ফলাফল তুলে ধরেন।
গবেষণায় সুস্থ ও রোগাক্রান্ত সুন্দরী গাছের টিস্যু থেকে অভ্যন্তরীণ ছত্রাক সংগ্রহ করে এর মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সুস্থ সুন্দরী গাছে উপকারী ছত্রাকের আধিক্য রয়েছে। বিশেষ করে উপকারী ছত্রাক বেশি পরিমাণে পাওয়া গেছে, যেগুলো গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ক্ষতিকর রোগজীবাণু দমনে কার্যকর বলে পরিচিত।
অন্যদিকে আগামরা রোগে আক্রান্ত গাছে রোগসৃষ্টিকারী বা সুযোগসন্ধানী ছত্রাকের আধিপত্য লক্ষ্য করা গেছে। গবেষকদের মতে, এসব ছত্রাক সাধারণত দুর্বল গাছে আক্রমণ করে এবং দ্রুত গাছের ক্ষতি বাড়িয়ে তোলে।
গবেষকরা বলছেন, আগামরা রোগের ক্ষেত্রে শুধু লবণাক্ততা বৃদ্ধি, পুষ্টির ঘাটতি বা পরিবেশগত পরিবর্তন নয়, বরং গাছের অভ্যন্তরীণ অণুজীবীয় ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উপকারী ছত্রাক কমে গেলে রোগসৃষ্টিকারী ছত্রাক সহজেই গাছের ভেতরে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে।
গবেষকদের ধারণা, ভবিষ্যতে 'ট্রাইকোডার্মা-বেইজড ট্রিটমেন্ট' ব্যবহার করে সুন্দরী গাছকে আগামরা রোগ থেকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি কিছু নির্দিষ্ট ছত্রাককে বায়্যোইন্ডিকেটর হিসেবে ব্যবহার করে রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
সেমিনারে জানানো হয়, ১৯৭০-এর দশকে প্রথম সুন্দরী গাছে একটি অস্বাভাবিক রোগের লক্ষণ দেখা যায়। গাছগুলো অজ্ঞাত এক রোগে মারা যেতে শুরু করে। প্রাথমিকভাবে গাছের ডালপালা পাতাশূন্য হয়ে পড়ে। পরে রোগটি ধীরে ধীরে গাছের ওপর থেকে নিচের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। একসময় পুরো গাছ পত্রবিহীন মৃত কাঠে পরিণত হয়, যদিও শিকড় তখনও মাটির সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। পরবর্তীতে এই রোগের নাম দেওয়া হয় 'টপ ডাইং' । এক দশকের মধ্যে রোগটি সমগ্র সুন্দরবনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৮৫ সালের এক জরিপে সুন্দরবনজুড়ে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লক্ষ রোগাক্রান্ত সুন্দরী গাছ শনাক্ত করা হয়। এদের প্রায় অর্ধেকের মুকুটের অর্ধেকেরও বেশি অংশ ঝরে গিয়েছিল। পরবর্তী কয়েক দশকে রোগটি প্রায় ১৫ শতাংশ সুন্দরী গাছকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলে।
গবেষকরা জানান, বর্তমানে অবশিষ্ট গাছগুলোর প্রায় অর্ধেকেই কমবেশি রোগের উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। গত ৩০ বছরে শুধু আগামরা রোগের কারণে প্রায় ১৪ লক্ষ ঘনমিটার সুন্দরী কাঠ ধ্বংস হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। যে গাছের নামে সুন্দরবনের নামকরণ, সেই গাছই আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বলে মনে করছেন গবেষকরা।