ফসল ও মৎস্য খাতে কোটি টাকার ক্ষতি
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
টানা ভারী বৃষ্টিতে সাতক্ষীরা পৌরসভাসহ সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। ডুবে গেছে বাড়িঘর, ভেঙে পড়েছে স্যানিটেশন ব্যবস্থা, ছড়িয়ে পড়ছে পানিবাহিত ও চর্মরোগ।
একইসঙ্গে ছয় হাজার হেক্টর আউশ ধান ও সবজি ক্ষেত তলিয়ে গেছে এবং ২০০টির বেশি মাছের ঘের ভেসে যাওয়ায় মৎস্য খাতে কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ১৮ জুলাই সকাল ৬টা পর্যন্ত জেলায় মোট ৪৫৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে ১০ জুলাই একদিনেই সর্বোচ্চ ২২৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
পৌরসভার কামালনগর, ইটাগাছা, মধুমল্লারডাঙ্গী, বদ্দীপুর কলোনি, মধ্যকাটিয়া, রইচপুর, রাজারবাগান, পুরাতন সাতক্ষীরাসহ সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কোমরসমান পানি জমে রয়েছে। অনেক স্থানে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। জলমগ্ন ঘরবাড়িতে রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে, সাপ ও পোকামাকড়ের উপদ্রবে আতঙ্ক বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং শহরতলীতে অপরিকল্পিতভাবে মাছের ঘের নির্মাণের কারণে বৃষ্টির পানি নামতে পারছে না।
বদ্দীপুর কলোনির বাসিন্দা ছলেমা খাতুন বলেন, ‘এক যুগ ধরে বৃষ্টি হলেই আমাদের এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়। রান্নাবান্না করা যায় না, ছেলে-মেয়েরা স্কুল-কলেজে যেতে পারে না। প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় থেকেও ন্যূনতম নাগরিক সেবা পাচ্ছি না’।
রইচপুরের আবু জাফর বলেন, ‘নিচু এলাকায় মাছের ঘের থাকায় পানি নামছে না। দীর্ঘদিন জমে থাকা পানিতে চর্মরোগ বেড়েছে’।
ইটাগাছার মোকাররম বিল্লাহ জানান, পরিবারের প্রায় সবার পায়ে ঘা ও চর্মরোগ দেখা দিয়েছে। মধ্যকাটিয়ার জাহানারা বেগম বলেন, রাস্তা ডুবে থাকায় শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে যেতে পারছে না, চলমান পরীক্ষার্থীরাও চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
নাগরিক অধিকার উন্নয়ন কমিটির সহ-সভাপতি ডাক্তার আবুল কালাম বাবলা বলেন, শহরের মধ্যে বিধিবহির্ভূত ভবন নির্মাণ এবং শহরতলীতে যত্রতত্র মাছের ঘের জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ। সমস্যা সমাধানে খাল পুনঃখনন, অবৈধ ঘের ও নেট-পাটা অপসারণ জরুরি।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত জানান, জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন স্থানে খাল খনন, ড্রেন নির্মাণ ও পানিনিষ্কাশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বদ্দীপুর কলোনির পানি নিষ্কাশনের জন্য কলু মোল্লার খালের চর অপসারণ এবং কামালনগর খালের সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সিল্টে ভরাট হয়ে যাওয়া স্লুইস গেটগুলো সচল করার কাজও চলছে।
অতিবর্ষণের প্রভাবে জেলার ৬৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জলাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রুহুল আমিন। এর মধ্যে আশাশুনিতে ২০টি, কলারোয়ায় ১০টি, তালায় ১টি, শ্যামনগরে ১২টি এবং সদর উপজেলায় ২০টি বিদ্যালয় রয়েছে।
চেয়ার-টেবিল ও বেঞ্চ পানিতে ডুবে যাওয়ায় পাঠদান ব্যাহত হলেও অধিকাংশ বিদ্যালয়ে কষ্ট করে ক্লাস চালানো হচ্ছে। তবে সদর উপজেলার বাগডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিম জানান, বৃষ্টির পানিতে ২০০টির বেশি মাছের ঘের ভেসে গিয়ে আনুমানিক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, জলাবদ্ধতায় প্রায় ৬ হাজার হেক্টর আউশ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন এলাকার সবজি ক্ষেতও নষ্ট হয়েছে।