পতঙ্গ
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
, ঢাকা
নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য তার ‘কাজের লোক’ কবিতায় কর্মব্যস্ত মৌমাছির বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে: ‘মৌমাছি, মৌমাছি, কোথা যাও নাচি নাচি দাঁড়াও না একবার ভাই। ওই ফুল ফোটে বনে, যাই মধু আহরণে দাঁড়াবার সময় তো নাই।’
প্রকৃতপক্ষে মৌমাছি উপমাবিহীন কর্মব্যস্ত হওয়ায় এই গ্রহবাসী নানাভাবে উপকৃত হতে পারছে। কারণ বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ খাবারের মূল জোগানদাতা হচ্ছে ফুলের পরাগায়ণ। আর এই কাজটি হয় মৌমাছির সাহায্যে। আবার পরাগায়ণ ও মধুর জন্য মানুষ প্রধানত মৌমাছির ওপরই নির্ভরশীল।
অবশ্য নানা বৈশ্বিক কারণে এখন মৌমাছির মাধ্যমে পরাগায়ণের হার কমে যাচ্ছে। আলবার্ট আইনস্টাইন তাই হুঁশিয়ার করে গেছেন, ‘ধরণীর পৃষ্ঠতল থেকে যদি মৌমাছি হারায়, চার বছরের মাথায় এ ধরণী আর বসবাসের যোগ্য থাকবে না।’
তবে কিছু ক্ষতিকর কীটনাশকের কারণে বিশ্বে মৌমাছির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে।
পৃথিবীতে প্রায় ২০ হাজার প্রজাতির মৌমাছি আছে। এদের কেউ একা থাকে, আবার কেউ বা থাকে দলবদ্ধভাবে। কেউ প্রচুর মধু জমা করে, আবার কেউ একেবারেই করে না। কেউবা উদ্দাম, পোষ না মানা, ঘুরে বেড়ায় বনে-বাদাড়ে। আবার কেউ কেউ মানুষের পোষ মানে।
মৌমাছিদের প্রাসাদ ‘মৌচাক’ নামে পরিচিত। মৌমাছিরা এটি তৈরি করে শীত বা অত্যধিক গরম থেকে নিজেদের বাঁচাতে, খাবার জমা রাখতে এবং থাকার জন্য স্থায়ী আশ্রয় হিসেবে। এক একটি মৌচাকে ২০ হাজার থেকে এক লাখ পর্যন্ত মৌমাছি থাকে।
এদের প্রধানত তিনটি শ্রেণি আছে। রানী মৌমাছি, রাজা মৌমাছি আর কর্মী মৌমাছি। রানী একজন হলেও মৌমাছিদের রাজা থাকে কয়েকশ’। বাকিরা সব কর্মী।
রানী মৌমাছির কাজ হচ্ছে মৌচাকের বাকি কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা আর ডিম পাড়া। প্রতিদিন এরা এক হাজারের বেশি ডিম পাড়ে। রানী মৌমাছি বাঁচেও বেশিদিন—চার থেকে সাত বছর। অথচ একটি রাজা মৌমাছি বাঁচে মাত্র কয়েকদিন আর একটি কর্মী মৌমাছি বাঁচে বড়জোর কয়েক সপ্তাহ মাত্র। যদি ডিম ফুটে কোনো নতুন রানী মৌমাছির জš§ হয় তখন মৌচাকটি দুভাগে ভাগ হয়ে যায়।
মৌমাছিরা খুবই শান্তিপ্রিয়। বিনা কারণে এরা কাউকেই বিরক্ত করে না। শুধু আত্মরক্ষার জন্যই এরা হুল ফোটায়। কর্মী মৌমাছিরা মাত্র একবারই হুল ফোটাতে পারে। হুল ফোটানোর পরে ওই কর্মী মৌমাছি সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। পৃথিবীতে হুল ছাড়াও ১৪ প্রজাতির মৌমাছি আছে।
মৌমাছিরা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে মৌচাকে নিয়ে এসে একটা ঘরে জমা করে। সে সময় মধুতে পানির পরিমাণ বেশি থাকে। কর্মী মৌমাছিরা ডানা দিয়ে বাতাস করে পানির পরিমাণ কমিয়ে ফেলে। এক সময় যখন ঘরটা পূর্ণ হয়ে যায় তখন এরা মধুর ঘরটাকে মোমের ঢাকনা দিয়ে আটকে দেয় যেন বাইরে থেকে ভেতরে ময়লা না পড়ে।
মৌচাক তৈরিতে মোম ব্যবহৃত তো হয়ই, আবার মোম থেকে আমাদের জন্য ওষুধও তৈরি হয়।
মৌমাছির বিষ প্রয়োগ করে চিকিৎসার পদ্ধতির নাম ‘এপিথেরাপি’। এই পদ্ধতি হাজার তিনেক বছরের পুরনো। চীন ও ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় এখনও এপিথেরাপির প্রচলন রয়েছে।
মৌচাক জ্যামিতিবিদদের কাছে পরম বিস্ময়। কারণ মৌমাছিরা অত্যন্ত চৌকসভাবে স্বল্প পরিসরে অসংখ্য ছয়-কোনা ঘর বানাতে পারে। অন্যদিকে মোম তৈরি হয় মৌমাছির পেটের উপরের অংশে অবস্থিত গ্রন্থির লালা থেকে। আর এক পাউন্ড মোম থেকে অকল্পনীয় শৈল্পিক নৈপুণ্যে মৌমাছি ৩৫ হাজার ছয়-কোনার ঘর বানাতে পারে, যেগুলোর নিচের দিক খোলা থাকে।
আবার পুরুষ মৌমাছি গাছের বাকল থেকে ধুনাজাতীয় আঠালো রস সংগ্রহ করে এসব কক্ষে উপরিভাগে লেপ্টে দেয়। তাই বৃষ্টির পানি মৌচাকে ঢুকতে পারে না।
বিজ্ঞানীরা বলেন, মাত্র এক পাউন্ড মধু বানাতে সাড়ে ৫শ’ মৌমাছিকে ২৫ লাখ ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করতে হয়। আর এই পরিমাণ মধু সংগ্রহ করতে ফুলে ফুলে ভ্রমণ করতে হয় ৮০ হাজার বার। উল্লেখ্য, একটি মৌচাকে ৫০ থেকে এক লাখ মৌমাছি থাকে আর একটি মৌচাকে ২২ পাউন্ড পর্যন্ত মধু জমা হতে পারে।
যখন ফুল পাওয়া যায় না, তখন মৌমাছিরা ফল থেকে রস সংগ্রহ করে। কিন্তু এদের চোয়াল খুব একটা শক্ত না হওয়ার কারণে সব ধরনের ফল থেকে রস শোষণ করতে পারে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এরা ফলে পচন ধরার পরই রস সংগ্রহ করে।
মৌচাক থেকে মোম মেলে। প্রাকৃতিক এই উপাদান দিয়ে মোমবাতি, ভ্যাসলিন, কসমেটিকস, রঙিন চকখড়ি, ময়েশ্চারাইজারসহ নানা পণ্য তৈরি হয়।