প্রত্নতত্ত্ব
রাসেল মাহমুদ
, যশোর
যশোরের কেশবপুর উপজেলার গৌরীঘোনা ইউনিয়নের ভরত ভায়না গ্রাম। বুড়িভদ্রা নদীর তীরবর্তী এ গ্রামেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দেড় হাজার বছরেরও বেশি পুরনো এক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ‘ভরতের দেউল’ বা ‘ভরত রাজার দেউল’ নামে পরিচিত।
প্রাচীন এই স্থাপনাটি দেখতে অনেকটা পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের মতো। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও খননকাজে পাওয়া ইট, পোড়ামাটির মূর্তি ও অন্যান্য নিদর্শন বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন, এটি খ্রিস্টীয় তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ শতকের মধ্যে নির্মিত একটি প্রাচীন মন্দির। ফলে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাস ও স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে ভরত ভায়নার দেউল বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, স্থাপনাটিতে মোট ৮২টি বদ্ধ প্রকোষ্ঠ রয়েছে। এগুলো ধাপে ধাপে ওপরের দিকে উঠে গেছে। ঢিবির শীর্ষ ধাপের দেয়াল প্রায় ৯ ফুট প্রশস্ত। সেখানে প্রায় ৬ ফুট ১০ ইঞ্চি প্রস্থের চারটি বর্গাকার প্রকোষ্ঠ রয়েছে। ধারণা করা হয়, এসব প্রকোষ্ঠের ওপরই মূল স্থাপনার প্রধান কক্ষ নির্মিত হয়েছিল।
দ্বিতীয় ধাপের দেয়াল প্রায় ৩ ফুট চওড়া এবং সেখানে বিভিন্ন আকৃতির ১৯টি প্রকোষ্ঠ রয়েছে। তৃতীয় ধাপে রয়েছে ১৮টি প্রকোষ্ঠ। চতুর্থ ধাপে রয়েছে ১৯টি বদ্ধ প্রকোষ্ঠ। সর্বশেষ ধাপে ১০ থেকে ১৩ ফুট চওড়া দেয়ালের মধ্যে রয়েছে ২২টি প্রকোষ্ঠ। এর নিচে রয়েছে প্রায় ১০ ফুট চওড়া প্রদক্ষিণ পথ।
মূল স্থাপনার চারদিকে চারটি প্রবেশপথের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। গঠনশৈলী বিবেচনায় পূর্বদিকের প্রবেশপথটিই মূল প্রবেশপথ ছিল বলে প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা। স্থাপনাটি নির্মাণে ব্যবহৃত ইটের মাপ প্রায় ৩৬, ২৬ ও ৬ সেন্টিমিটার। এতো বড় আকৃতির ইট এ অঞ্চলের অন্য প্রত্নস্থাপনায় খুব বেশি দেখা যায়নি বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
খননকাজে ধ্বংসাবশেষের পাশাপাশি গুপ্তযুগের পোড়ামাটির মাথা, মানুষের হাত-পায়ের ভগ্নাংশ, মাটির প্রদীপ, অলংকৃত ইটের টুকরা, পদচিহ্নসম্বলিত দুটি ইট এবং একটি ছোট মাটির পাত্র পাওয়া গেছে। এসব প্রত্ননিদর্শনের কিছু খুলনা বিভাগীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।
বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ভরত ভায়নার দেউল। ভদ্রা নদীর সেতু পার হয়ে মেঠোপথ ধরে কিছুদূর এগোলেই চোখে পড়ে প্রাচীন এ স্থাপনার চূড়া। চারপাশে সবুজ গাছপালা, বাঁশঝাড় ও পাখির কলকাকলিতে জায়গাটির পরিবেশও বেশ মনোরম। দেউল প্রাঙ্গণে রয়েছে একটি বড় বটগাছ, যা দর্শনার্থীদের বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে।
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাটি দেখতে আসেন দর্শনার্থীরা। স্থানীয় দর্শনার্থী হাফিজুর রহমান বলেন, ভরত রাজার দেউল দেখে মুগ্ধ হয়েছি। এত পুরোনো একটি স্থাপনা আমাদের এলাকায় রয়েছে, এটি সত্যিই গর্বের বিষয়। জায়গাটির আরও উন্নয়ন ও প্রচার করা প্রয়োজন।
কেশবপুর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের নেতা উৎপল দে বলেন, ভরত রাজার দেউল কেশবপুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তি। এটি আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে থাকা এ স্থানটি আরও সুন্দরভাবে সংরক্ষণ ও পর্যটনবান্ধব করা গেলে দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করা সম্ভব।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনার তৎকালীন আঞ্চলিক পরিচালক লাভলী ইয়াসমিন বলেন, ভরতের দেউলটি ১৯৮৪ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় আনা হয়। পরবর্তী সময়ে খননকালে এখানে মানুষের দেহাবশেষসহ বিভিন্ন পুরনো জিনিসপত্র পাওয়া গেছে, যা দেউলের জাদুঘরে সংরক্ষিত করা আছে। ধারণা করা হয়, এই বৌদ্ধ মন্দিরটি ৭-৯ শতকে নির্মাণ করা হয়। এটি একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে তোলা হবে।