যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

বিলুপ্তির পথে গুই সাপ

রূপক মুখার্জি

, লোহাগড়া (নড়াইল)

প্রকাশ : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১২:০০ পিএম
বিলুপ্তির পথে গুই সাপ

কালচে বাদামি শরীরের ওপর হলুদ ফোঁটা ও চক্রাকার নকশা। আকারেও বেশ বড়। খাল-বিল, পুকুর, জলাশয়, ঝোপঝাড় কিংবা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে একসময় প্রায়ই দেখা মিলত প্রাণীটির। স্থানীয়ভাবে ‘গুই সাপ’, ‘সোনা গুইসাপ’ বা ‘কালো গুই সাপ’ নামে পরিচিত এই সরীসৃপ এখন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে নড়াইলের প্রকৃতি থেকে।

বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রাণীটির বৈজ্ঞানিক নাম Varanus salvator। এটি জল ও স্থল দুই পরিবেশেই চলাফেরা করতে পারে। দক্ষ সাঁতারু হওয়ার পাশাপাশি গাছে ওঠার ক্ষেত্রেও বেশ পারদর্শী। তবে, আবাসস্থল ধ্বংস, জলাশয় ভরাট, ঝোপঝাড় উজাড়, নির্বিচারে শিকার এবং মানুষের ভুল ধারণার কারণে প্রাণীটির অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে।

নড়াইল সদর, কালিয়া ও লোহাগড়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকায় এখনও মাঝেমধ্যে গুইসাপের দেখা মেলে। কেউ কেউ বড় আকৃতির গুইসাপকে ঘড়িয়াল মনে করেন। তবে এটি মূলত গুইসাপ বা সরীসৃপ।

বিষহীন এই প্রাণীটি সাধারণত মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকে। বিপদ অনুভব করলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যায়। মানুষের জন্য ক্ষতিকর না হলেও গুই সাপকে নিয়ে গ্রামাঞ্চলে এখনও নানা ভুল ধারণা রয়েছে। বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড় কিংবা বসতবাড়ির আশপাশে প্রাণীটি দেখা গেলে অনেকে এটিকে বিষাক্ত বা বিপজ্জনক মনে করে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অনেক সময় পিটিয়ে মেরেও ফেলা হয়।

অথচ, প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলে গুইসাপের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ইঁদুর, সাপ, ব্যাঙ, কাঁকড়া, বিভিন্ন ছোট প্রাণী এবং পচা-গলিত মৃতদেহ খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বিরাট ভূমিকা রাখে প্রাণীটি। এ কারণে গুইসাপকে প্রকৃতির ‘নীরব পরিচ্ছন্নতাকর্মী’ও বলা হয়। মৃত প্রাণীর দেহ থেকে পরিবেশ দূষিত হওয়ার ঝুঁকি কমাতেও এদের ভূমিকা রয়েছে।

লোহাগড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শ্যামল কৃষ্ণ রায় বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ক্ষতিকারক পোকামাকড় ও ইঁদুর নিয়ন্ত্রণে গুইসাপের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পচা, গলিত ও মৃতপ্রাণী খেয়ে এরা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে।

স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা বলছেন, কয়েক দশক আগেও নড়াইলের গ্রামীণ জনপদে গুইসাপ তুলনামূলক বেশি দেখা যেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বসবাসের জায়গা কমে গেছে। খাল-বিল ও পুকুর ভরাট, জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হওয়া, বসতবাড়ি ও স্থাপনা নির্মাণ এবং ঝোপঝাড় কেটে ফেলার কারণে গুইসাপের নিরাপদ আশ্রয়স্থল সংকুচিত হচ্ছে।

নড়াইল সদর ও লোহাগড়ার বিভিন্ন এলাকায় জলাশয় ও কৃষিজমির আশপাশের ঝোপঝাড় কমে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্রও সংকুচিত হচ্ছে। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে কালিয়া এলাকাতেও। ফলে আগে যেসব এলাকায় নিয়মিত গুইসাপের দেখা মিলত, সেসব এলাকায় এখন খুব কমই প্রাণীটির দেখা পাওয়া যায়। এক কথায়, কালেভদ্রে দেখা যায় গুই সাপ।

আবাসস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি অতীতে চামড়ার জন্যও গুইসাপ শিকার করা হতো। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারে গুইসাপের চামড়ার চাহিদা থাকায় একসময় নির্বিচারে শিকার হয়েছে প্রাণীটি। বর্তমানে আইনগত সুরক্ষা থাকলেও অবৈধ শিকার ও পাচারের ঝুঁকি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

জেলার জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী কাজী হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, সরীসৃপ আমাদের জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাণী। এটি বিষহীন এবং সাধারণত মানুষের কোনো ক্ষতি করে না। বরং ইঁদুর, বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রাণী ও মৃতজীব খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু আবাসস্থল ধ্বংস ও মানুষের ভুল ধারণার কারণে প্রাণীটি দিন দিন কমে যাচ্ছে। সরীসৃপ দেখলেই ভয় না পেয়ে এটিকে নিরাপদে চলে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। একইসঙ্গে খাল-বিল, জলাশয় ও ঝোপঝাড় সংরক্ষণ এবং বন্যপ্রাণী শিকার বন্ধে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)