যশোর, বাংলাদেশ || রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

উদ্ভিদতত্ত্ব

কলাগাছ এক ধরনের ঘাস

জিয়াউদ্দিন সাইমুম

, ঢাকা

প্রকাশ : রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১০:০০ এ এম
কলাগাছ এক ধরনের ঘাস

কলাপ্রেমী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলা খাওয়ার এক রেসিপিতে বলেছেন:
‘আমসত্ত্ব দুধে ফেলি, তাহাতে কদলী দলি, সন্দেশ মাখিয়া দিয়া তাতে।
হাপুস হুপুস শব্দ, চারিদিক নিস্তব্ধ, পিঁপড়া কাঁদিয়া যায় পাতে।’

কলা, আমসত্ত্ব, দুধ আর মিঠাইয়ের মণ্ড দিয়ে তৈরি খাবারটি সত্যি চেটেপুটে খাওয়া যায়। তবে চিড়ায় কলা মেখেও খাওয়ার রেসিপি মেলে নিচের ছড়ায়:
‘ওঁ প্রজাপতি ঋষি, পাতা পেড়ে বসি।
চিপিটক সহিত রম্ভা চর্বণে বিনিয়োগঃ।’

উল্লেখ্য, চিপিটক মানে চিড়া আর রম্ভা মানে কলা।

সন্দেহ নেই, কলা আমাদের দেশের একটি জনপ্রিয় ফল। এমন লোক খুব কমই আছেন যিনি কলা পছন্দ করেন না। ইতিহাসে রয়েছে, খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ সালে ভারতবর্ষ আক্রমণে এসে মহাবীর আলেকজান্ডার কলা দেখেছেন।

তবে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশে দিন দিন নিরাপদ খাদ্য হয়ে যাচ্ছে অনিরাপদ। কলা খেয়ে উপকারের বদলে অপকারই হচ্ছে বেশি। অন্যদিকে কলায় প্রকৃত স্বাদ আর নেই। কারণ খাদ্যকে অখাদ্য বানাতে সম্ভবত আমাদের জুড়ি নেই। অথচ মেধাসম্পন্ন জাতি গঠনে, নিরাপদ খাদ্যের বিকল্প নেই।

বিশ্বে পাঁচ শতাধিক প্রজাতির কলার সন্ধান মিলেছে। কাঁচা অবস্থায় এটা সাধারণত সবুজ বা সবুজাভ থাকলেও পাকলে এটা হলুদ হয়ে যায়। প্রজাতিভেদে লাল বা লালচে রঙেরও হতে পারে।

বৈজ্ঞানিক শ্রেণিকরণের দিক থেকে কলাগাছ ‘তৃণ’ ছাড়া আর কিছুই নয়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে কলাগাছের উৎপত্তিস্থল ধরা হলেও হালের বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পাপুয়া নিউগিনি দ্বীপেই এটা প্রথম জš§ নিতে পারে। বর্তমানে বিশ্বের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ১০৭টি দেশে কলা গাছ দেখা যায়।

আঁশ ও মদ তৈরি এবং আলঙ্কারিক গাছ হিসাবেও কলা গাছের ব্যবহার রয়েছে। কলা দিয়ে জ্যাম ও কেকও তৈরি করা যায়। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কলা গাছের শাঁস ও থোড় সবজি ও স্যুপ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ, কর্নাটক ও কেরালায় কলাপাতার ওপর খাবার পরিবেশনের ঐতিহ্য রয়েছে।

জাপানে কলার আঁশ থেকে উন্নতমানের কাপড় তৈরি হয়। এটার আঁশ দিয়ে নেপালিরা বিশেষ ধরনের কম্বল বানায়। কাগজও তৈরি হয় আঁশ দিয়ে।

অধিকাংশ কলা গাছ দুই বছর পর্যন্ত বাঁচে। বাতাসের ঝাপটায় কলার লম্বা পাতা ছিড়ে যায় বলে দেখতে বেশ লাগে। তবে অন্য যে কোনো ফলের চেয়ে কলা একটু বেশি তেজষ্ক্রিয়। কারণে এতে পটাশিয়ামের মাত্রা একটু বেশি থাকে। আবার কাঁচা অবস্থায় কলায় কার্বোহাইড্রেট বা শ্বেতসার বেশি থাকলেও যত বেশি পাকবে, চিনির পরিমাণ তত বাড়বে। যদিও কলার ৭৫ শতাংশ পানি। কলা বি-৬ নামের ভিটামিনের অন্যতম উৎস। এতে অন্য ভিটামিন, ম্যাঙ্গানিজ, আয়রন ও পটাশিয়ামও থাকে।
১৯২৩ সালে মুক্তি পাওয়া ফ্রাঙ্ক সিলভার এবং ইরভিন কোহনের লেখা ‘ইয়েস! উই হ্যাভ নো ব্যানানাস’ গানটি কয়েক দশক ধরে সংগীত চার্টে শীর্ষে ছিল।
কলার খোসায় পা পিছলে বিশ্বে প্রতিবছর অনেক লোক আহত হয়। তবে কলার খোসা নোংরা পানি পরিষ্কার করতে কারখানায় ব্যবহৃত হয়।

মওসুমি নয়, বছরজুড়েই কলা পাওয়া যায়। কার্বোহাইড্রেট, গ্লাইকোজেন ও বডি ফ্লুয়িড সরবরাহ করতে পারে বলে ম্যাচ অথবা অনুশীলন শেষে অ্যাথলেটরা কলা খান। কলার গুণ এখানেই শেষ নয়; এটায় নেই ফ্যাট, কোলেস্টেরল অথবা সোডিয়াম।

উৎপাদনের দিক থেকে বিশ্বের এই চতুর্থ ফলটি আঁশসমৃদ্ধ প্রাকৃতিক সুগার সুক্রোজ, ফ্রক্টোজ ও গ্লুকোজের অন্যতম উৎস। তাই বিজ্ঞানীরা রোগ প্রতিরোধী হাইব্রিড কলা উদ্ভাবনের চেষ্টা করছেন।

ইন্টারন্যাশনাল ব্যানানা অ্যাসোসিয়েশনের মতে, কলাই বিশ্বের আদি ফল হতে পারে। আমাদের অনেকেরই হয়তো জানা নেই, কলা পেটফাঁপা বা স্টমাক আপসেট থেকে রক্ষা করতে পারে। গবেষকরা বলছেন, কলা পাকস্থলী থেকে মিউকাস এবং এক ধরনের কোষের উৎপাদনকে উদ্দীপিত করে, যা পাকস্থলীর ঝিল্লি ও অ্যাসিডের মাঝে পর্দার মতো বাধার কাজ করে। তবে সবক্ষেত্রেই পেটফাঁপা ও বুকজ্বালা দূর করতে কলা কার্যকর হবে না। বিশেষ করে পেট ফাঁপাজনিত কারণে কেউ বমি করতে থাকলে কলা এবং কলার মতো অন্য কোনো শক্ত খাবারই তখন দেওয়া উচিত হবে না।

তবে বদহজমসহ পেটের গোলমালের ক্ষেত্রে শিশুদের জন্য উপযোগী ব্রাট (বিআরএটি) খাবারেরও অন্যতম উপাদান হচ্ছে কলা। ‘ব্রাট’ হচ্ছে বানানা, রাইস সিরিয়াল, আপেল সস ও টোস্টের সংক্ষিপ্ত রূপ। অনেক চিকিৎসকই শিশুদের পেটের গোলমালের পর বিশেষ করে ডায়রিয়ার পর এই ‘ব্রাট’ খাবার শিশুকে খাওয়ানোর পরামর্শ দেন।।

এদিকে কাঁচকলাকে কেউ কাঁচা কলা বা আনাজে কলা বলে। কাঁচকলা দিয়ে কোপ্তা, ডালনা বড়া, চপ, ছাকছি, ঘণ্ট ইত্যাদি নানাভাবে খাওয়া যায়। মাছ দিয়ে রান্না করেও খাওয়া যায়। পেটের অসুখ, আমাশয়ে এটা উপকারী। সদ্য রোগমুক্ত লোকের দুর্বলতা তাড়াতেও কাঁচকলা কার্যকর। এটা শরীর ও পেট ঠান্ডা রাখে।

কলা গাছের নানামুখী ব্যবহার রয়েছে। বন্যাপ্রবণ দেশে চার-পাঁচটি বা তারও বেশি কলা গাছ একসঙ্গে বেঁধে তৈরি করা যায় এক ধরনের অস্থায়ী জলযান। কম খরচে তৈরি করা যায় বলে গ্রামবাংলায় এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। বাংলার প্রাচীন লোকগাথা বেহুলা ও লখিন্দরের গল্পে কলার ভেলায় করে মৃতদেহ ভাসিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

কলা নিয়ে আগ্রহ-উদ্দীপক সংবাদটি হচ্ছে, এইচআইভি ভাইরাসের বিস্তার রোধে কলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন। পরীক্ষায় তারা দেখেছেন, কলায় ‘ব্যানলেক’ নামে একটি উপাদান বর্তমানে এইচআইভির চিকিৎসায় ব্যবহৃত দুটি ওষুধের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল কেমিস্ট্রিতে প্রকাশিত এক রিপোর্টে এ কথা বলা হয়। এতে বলা হয়, ব্যানলেকের ওপর ভিত্তি করে এইডসের চিকিৎসায় অনেক সস্তা ওষুধ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, যা দিয়ে লাখ লাখ মানুষের জীবন বাঁচানো যাবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। কলার এ উপাদানটি হচ্ছে ‘লেকটিন’ নামে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ। এটি কলার ভেতরে প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়। মার্কিন গবেষকরা দেখতে পান, কলার ভেতরে যে লেকটিনটি দেখা যায় সেটা শরীরে এইচআইভি ভাইরাসের প্রবেশপথে বাধা সৃষ্টির মাধ্যমে সংক্রমণ ঠেকিয়ে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের এইডস গবেষকদের প্রধান মাইকেল সোয়ানসন বলেন, ‘কিছু কিছু এইচআইভি ওষুধের বড় সমস্যা হচ্ছে ভাইরাস ওই ওষুধ নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে এবং ওষুধের বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু লেকটিনের উপস্থিতিতে তাদের সে কাজটি অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।’

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)