যশোর, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সুলতানি আমলের ‘গলাকাটা মসজিদ’

রাসেল মাহমুদ

, যশোর

প্রকাশ : শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১১:০০ এ এম
সুলতানি আমলের ‘গলাকাটা মসজিদ’

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থান। এ অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে সুলতানি আমলের প্রায় ৫০০ থেকে ৮০০ বছরের পুরনো নানা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এসব নিদর্শন জানান দেয়, একসময় বারোবাজারে গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ এক জনপদ। কালের বিবর্তনে সেই জনপদ হারিয়ে গেলেও মাটির নিচে চাপা পড়া স্থাপনা ও প্রত্ননিদর্শন আজও বহন করছে তার ইতিহাসের সাক্ষ্য।

ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়কের বারোবাজারকে কেন্দ্র করে প্রায় তিন থেকে চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে এসব প্রত্ননিদর্শন। ৮০-র দশকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর উঁচু মাটির ঢিবিগুলো খনন করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সন্ধান পায়। এর মধ্যে মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় সুলতানি আমলের ১৯টি মসজিদ। এসব স্থাপনার অন্যতম ‘গলাকাটা মসজিদ’।

১৯৯২-৯৩ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খননের মাধ্যমে মসজিদটি উন্মোচিত হয়। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন মাটির ঢিবির নিচে চাপা ছিল স্থাপনাটি। ঢিবির ওপর গজিয়ে উঠেছিল জঙ্গল ও বড় বড় গাছপালা। সেগুলো পরিষ্কার করে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে মসজিদটি দৃশ্যমান করা হয়।

বারোবাজারের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণ আন্দোলনের অন্যতম সদস্য আলমগীর হোসেন বলেন, ‘গলাকাটা মসজিদের মতো এ এলাকার অনেক মসজিদ দীর্ঘদিন মাটির নিচে চাপা ছিল। স্থানগুলো ছিল উঁচু ঢিবি। খননের পর এসব অনন্য নিদর্শন বেরিয়ে আসে।’

তিনি জানান, খননের সময় শাহ সুলতান মাহমুদ ইবনে হুসাইনের আমলের ৮০০ হিজরির আরবি ও ফারসি ভাষায় লেখা কয়েকটি পাথর পাওয়া যায়। এসব নিদর্শনের ভিত্তিতে মসজিদটি সুলতানি আমলে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা আফসার আলী (৭১), আবু তাহের (৭৪) ও রওশন আলীর (৭৩) সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গলাকাটা মসজিদ ও এর আশপাশের প্রত্নস্থাপনাগুলো দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের কাছে কৌতূহল ও আগ্রহের বিষয়। তাদের স্মৃতিতে এলাকাটি বহুদিন ধরেই পুরোনো স্থাপনা ও মাটির ঢিবির জন্য পরিচিত। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের পর এসব স্থাপনা দৃশ্যমান হওয়ায় স্থানীয় মানুষের আগ্রহ আরও বেড়েছে। তাঁরা ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও পরিচর্যার ওপর গুরুত্ব দেন।

তাহেরপুরের প্রধান সড়কের পাশে গাছগাছালিতে ঘেরা পরিবেশে মসজিদটির অবস্থান। চারপাশ সীমানাপ্রাচীর দিয়ে ঘেরা। মসজিদের ছাদে রয়েছে ছয়টি গম্বুজ। ভেতরে রয়েছে দুটি কালো পাথরের স্তম্ভ। চারটি ছয়কোণাকৃতির বড় স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে মসজিদের মূল কাঠামো।

মসজিদের পূর্ব দেয়ালে রয়েছে তিনটি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে ছিল দুটি করে প্রবেশপথ। পরবর্তী সময়ে সেগুলো ইটের জালি দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রবেশপথগুলোর ওপর রয়েছে সুচালো খিলান।

পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে তিনটি মেহরাব। পোড়ামাটির কারুকাজে অলংকৃত এসব মেহরাব ও দেয়ালে দেখা যায় জ্যামিতিক নকশা, ফুল-লতাপাতা, ঘণ্টা ও চেইনের নকশা। মেহরাবগুলোর প্রান্ত আয়তক্ষেত্রাকার ফ্রেমে বাঁধানো।

মসজিদের অভ্যন্তরীণ স্থাপত্যে পোড়ামাটির অলংকরণের ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। দেয়াল ও ছাদজুড়ে থাকা নকশাগুলো সুলতানি আমলের স্থাপত্যরীতির বৈশিষ্ট্য বহন করে।

মসজিদের পাশেই রয়েছে ‘গলাকাটা দীঘি’। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, দীঘিটি খানজাহান আলীর সমসাময়িক। চারপাশের পাড়সহ প্রায় ১২ বিঘা জমির ওপর অবস্থিত দিঘিটি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত।

দীঘিটির নামকরণ নিয়েও রয়েছে নানা জনশ্রুতি। একটি প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, বারোবাজারে এক অত্যাচারী রাজা ছিলেন। তিনি প্রজাদের হত্যা করে দীঘিতে ফেলে দিতেন। এ থেকেই দীঘিটির নাম ‘গলাকাটা দীঘি’ হয়েছে বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ মনে করেন।

আরেকটি জনশ্রুতি হলো, রাতে দীঘির ওপর দিয়ে গলাকাটা ঘোড়া চলাচল করতো। সেখান থেকেই দীঘিটির নামকরণ হয়েছে। মসজিদের নামও দীঘির নাম অনুসারে ‘গলাকাটা মসজিদ’ হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে ধারণা প্রচলিত রয়েছে। তবে এসব জনশ্রুতির কোনো নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

গলাকাটা মসজিদের স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক মসজিদের সাদৃশ্য রয়েছে। এর মধ্যে গৌড়ের ধবীচক ও ঝনঝনিয়া মসজিদ, ঢাকার রামপালের বাবা আদম মসজিদ, শৈলকুপার শাহি মসজিদ এবং বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদের নাম উল্লেখযোগ্য।

ইসলামি স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন হিসেবে গলাকাটা মসজিদ বারোবাজারের প্রাচীন ইতিহাস ও বাংলাদেশের প্রত্নঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে। মসজিদের চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পাশের দীঘি ঐতিহাসিক স্থাপনাটির আকর্ষণ আরও বাড়িয়েছে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)