যশোর, বাংলাদেশ || রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

শোধবোধ

মো. মিজানুর রহমান

প্রকাশ : রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১১:০০ এ এম
শোধবোধ

বিরাট বিপদ বা ঝুঁকি থেকে কেউ আমাদেরকে উদ্ধার করে দিলে আবেগে প্রায়ই আমরা বলে থাকি যে, ‘এ ঋণ কখনও শোধ হবে না।’ এটা কোনো বস্তুগত ঋণ নয়। এটি একটি আবেগীয় দায়। আমরা ধরেই নিই যে, আবেগীয় ঋণ পরিশোধযোগ্য নয়। এই ঋণের কোনো লাভ/সুদ/মুনাফা হয় না। ঋণ শোধ করার জন্য গ্রহীতার তাড়া থাকে না এবং দাতারও তাগাদা থাকে না। দীর্ঘমেয়াদে দাতা-গ্রহীতা বিস্মৃতও হয়ে যেতে পারেন। তবে আপনার জীবনে যদি এই দায় পরিশোধের কোনো সুযোগ তৈরি হয় অর্থাৎ ওই দাতার জীবনে আপনার সহযোগিতার সুযোগ থাকে এবং আপনি তা প্রকাশ্যে বা সজ্ঞানে এড়িয়ে যান তখন দেখবেন আপনার ওই আবেগীয় ঋণের সুদ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। অল্পদিনের মধ্যেই আপনি জেনে যাবেন যে, আপনার মন ছোট, হৃদয় পাথর, দৃষ্টি খাটো, আপনি স্বার্থপর, ছোটলোক, ইতর এবং সর্বশেষ আপনি অকৃতজ্ঞ হিসেবে বিবেচিত হবেন। আবেগীয় ঋণের সুদের হিসাব এইসব শব্দে হয়ে থাকে। মূল ঋণ (আসল) ধরাই থাকে।

কিছু মহৎপ্রাণ মানুষকে ঋণী করে রাখতে পছন্দ করে। তারা সাথে সাথে মুনাফা খোঁজে না। তারা অপেক্ষা করে শেষ দিনের প্রতিদানের। দুনিয়া এবং আখিরাতে তারা উত্তম প্রতিদানের অপেক্ষায় থাকে। এই ধরুন, আজকে আপনি অন্ধকে রাস্তা পার করে দিলেন। কালকে রিকশাওয়ালা তার রিকশার হুকে আপনার ফেলে আসা মাংশের প্যাকেট নিয়ে আপনার বাড়িতে হাজির। আর্থিক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেলেন। দান-প্রতিদান বা শোধবোধ হলো। আবার আপনি ওই রিকশাওয়ালাকে ধমকালেন এই জন্য যে, তিনি কেন সব গুছিয়ে না দিয়ে নতুন ভাড়া পেয়েই চলে গেলেন? পরদিন মাছ কিনে আরেক রিকশায় মাছ ঝুলানোর সেই হুকটাই পেলেন না। মাছ, মাংস, সবজি রিকশার পাদানিতে রেখে পাঁচ কেজি দই-মিষ্টি ঝুলানোর জন্য কোনো ব্যবস্থা রিকশায় থাকলো না। পাঁচ কেজি দই-মিষ্টি রিকশায় বসে হাতে ঝুলিয়ে আনতে হচ্ছে। অর্থাৎ ঋণের শোধবোধ আছেই।

এবার আসি সাওয়াব, পুণ্য বা নেকির বিষয়ে। প্রতিটি দানে ভ্যালু অ্যাড হয়। রমজানে এক টাকা দান করলে ৭০ টাকা দানের সাওয়াব/নেকি পাওয়া যায়। এই সূত্র ফলো করেই আমরা অধিকাংশ সামর্থবান মানুষ রমজানে দান করি। অর্থাৎ দানের মজুত হয়। আমরা হই দানের মজুতদার। মজুতকৃত দান বেশি দামে রমজানে ছাড়তে চেষ্টা করি। সিন্ডিকেট যেমন রমজানে পণ্য বেশি দরে বাজারে ছাড়ে। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাড়ির গেটে রমজানের ২৭-২৯ তারিখ বিরাট জটলা দেখা যায়। জাকাতের শাড়ি-লুঙি বা টাকা পাওয়ার আশায়। আমার জিজ্ঞাসা, ‘সারাবছর দানে বাধা কীসে? গরিবের চাহিদা কি শুধু রমজানেই?’

একজন রমজানে জাকাত হিসেবে চারটা শাড়ি পেলেন। তিনি দুটো শাড়ি রেখে দুটো সস্তায় বেচে দশ কেজি চাল কিনে নিলেন। আপনি যখন মেনেই নিয়েছেন আপনার সম্পত্তিতে গরিবের হক আছে তবে তা আপনার ইচ্ছা অনুযায়ী না দিয়ে গরিবের চাহিদা অনুযায়ী দিতে পারেন। অবশ্য এটাও হতে পারে যে, রমজান ও কুরবানির ঈদে আপনার বাড়ির গেটে গরিবের ভিড় আপনাকে সমাজে উঁচু অবস্থানে নিয়ে যাবে এই আশাতে দানের এই ফর্মুলা ব্যবহার করছেন। যখন আপনার দানের অর্থে একজন স্বাবলম্বী হতে পারতেন, তার চাহিদা/অভাব পূরণের সুযোগ পেতেন, তখন তিনি আপনার দানের অর্থ না পেয়ে হয়তো ঋণ করেই চলছেন। আর দানের সেই অর্থ আপনার ব্যবসায় বা ব্যাংকে মুনাফা করছে। অর্থাৎ আপনার কারণেই একজন ঋণগ্রস্ত হলেন। এই হিসাব শুধু তাদের জন্য যারা নেকি নিয়ে ভাবেন, গরিবের হক নিয়ে ভাবেন, যারা ভাবে দানের প্রতিদান আখিরাতে পাবেন।

ও হ্যাঁ, আমাদের শহরাঞ্চলে যত বিলাসবহুল আলিশান বাড়ি দেখা যায় তার মধ্যে অনেক বাড়ির ওয়ালেই লেখা থাকে বাড়িটি কোনো এক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দায়বদ্ধ। আবার বাড়িতে সাইনবোর্ড না থাকলেও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের যে ঋণ আছে তার সুদ-আসল শোধ করতে ব্যবসার সাথে বাড়িটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দায়বদ্ধ হয়ে আছে। কারণ গ্রহীতা ঋণ যখন নিয়েছেন তখন নিজের আয় বিবেচনা করেননি, ভবিষ্যৎ ভাবেননি। ব্যবসা আছে এক টাকার, ঋণ নিয়েছেন দেড় টাকার। ব্যাস বাড়ি ব্যবসায় ঢুকে গেল। দায়-দেনায় নাজেহাল অবস্থা। তখন আল্লাহকে ডেকে তার রহমত-বরকত হাজির করার চেষ্টা করছেন। হয়তো সুযোগে হজ করে বাজারের হাজিসাব পরিচয়ও জুটিয়ে নিয়েছেন। মাথায় টুপি, গায়ে আতর, হাতে তসবিহ উঠেছে। অথচ হালাল ব্যবসায়ীর মাথায় মস্ত ঋণের দায় চেপে আছে। হিসেব করে দেখলেন, অঢেল সম্পত্তি তার মোট ঋণের ৭৫%। তখন তিনি বুঝলেন, ঋণ সহায়তা মানে ঋণনির্ভরতা নয়। তিনি ঋণসহায়তা নিতে গিয়ে ঋণনির্ভর হয়ে পড়েছেন।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এবং নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় ব্যবহার করলে আফিম, প্যাথেড্রিন এবং ফেনসিডিল মূলত তীব্র ব্যথা উপশম, কাশি নিরাময় এবং চেতনানাশক হিসেবে অত্যন্ত কার্যকরী সুফল দেয়। কিন্তু এটার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া মানে নেশাখোর বনে যাওয়া। ঋণও তাই। ঋণদাতা প্রাথমিকভাবে যে পরিমাণে সহায়তা দিতে চান, সেই পরিমাণটাই গ্রহীতার জন্য ঠিক থাকে। কিন্তু গ্রহীতা ঋণটাকে নির্ভরতা করে ফেলে। তারপর ব্যবসার আয় অপেক্ষা ব্যয় বাড়তে থাকে। জীবনের উচ্চ মান এবং সুদের উচ্চ হার মিলিয়ে ব্যবসায়ের মূলধন কমতে থাকে। বাড়ির সিংহ দরজায় দান নিতে মানুষের জটলা আর অন্দরমহলে বাড়ি হারানোর ভয়। এই করতে করতে সব হারিয়ে নিজের বলতে শুধু মাথার টুপি আর গায়ের আতরের গন্ধটুকুই রয়। বাকি সব সুদের দুধ মহাজনের বাটিতে চলে যায়।

আপনি যদি ঋণকে সহায়তা না ভেবে নির্ভরতা ভাবেন তাহলে বুঝবেন গাভীর ওলানে থাকা দুধ সুদ বাবদ, আর ঋণ হচ্ছে গাভী। ভাবছেন বাছুর আপনার লাভ? গাভীর খাবার, গোয়ালের বিদ্যুৎ বিল, গোয়ালার পারিশ্রমিক সব মিলিয়ে এক বাছুরে খরচ ওঠে? হিসেব করে দেখেন, অতিরিক্ত ঋণের কারণে গাভী, দুধ, বাছুর সব হারিয়ে আপনার হাতে থাকলো দড়ি, গোবর আর খুটো।

ঋণ তা আবেগীয় বা আর্থিক যে ধরনেরই হোক, অবশ্যই পরিশোধযোগ্য ও পরিশোধ সামর্থের মধ্যেই থাকতে হবে এবং তা শোধ করার বোধ থাকতে হবে। নতুবা আপনার-আমার অকৃতজ্ঞ অথবা দেউলিয়া পরিচয় পলকেই ছড়িয়ে পড়বে।

লেখক: যুগ্মপরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক, খুলনা

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)