মোহা. হুমায়ুন কবির
, কয়রা (খুলনা)
দুই বছর পর আবারও প্রাণের স্পন্দনে জাগতে শুরু করেছে উপকূলের মাটি। খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশীতে আবার বসছে ঐতিহ্যবাহী ‘কাছারীবাড়ী বৃক্ষমেলা’। আজ শুক্রবার থেকে কাছারীবাড়ী বাজারসংলগ্ন সুবিশাল মাঠে শুরু হতে যাচ্ছে দশদিনব্যাপী এই উৎসব।
মেলা উদযাপন উপলক্ষে গত ২২ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয় প্রস্তুতিমূলক প্রথম সভা। এতে সর্বসম্মতিক্রমে বেদকাশী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সরদার মতিয়ার রহমানকে সভাপতি এবং ইউপি সদস্য শেখ সিরাজুল ইসলামকে সাধারণ সম্পাদক করে মেলা পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়।
আয়োজকরা জানান, উপকূলে সবুজ বিপ্লব ঘটাতে এবং মানুষের মাঝে পরিবেশ সচেতনতা জাগিয়ে তুলতেই এই উদ্যোগ। মেলায় দেশি-বিদেশি দুর্লভ প্রজাতির ফলদ, বনজ ওষধি চারার সমাহার ঘটবে।
কাছারীবাড়ী বৃক্ষমেলার ইতিহাস প্রায় দুই দশকেরও বেশি পুরনো। ২০০১ সালে উত্তর বেদকাশীর উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা স ম নজরুল ইসলামের দূরদর্শী ভাবনায় এই মেলার গোড়াপত্তন হয়। তার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় সূচিত ছোট্ট আয়োজনটি সময়ের পরিক্রমায় হয়ে ওঠে পুরো দক্ষিণ খুলনার সর্ববৃহৎ সবুজ মিলনমেলা।
প্রতিবছর মেলায় লাখ লাখ টাকার চারা কেনাবেচার পাশাপাশি জমে উঠতো লোকজ উৎসব। দূর-দূরান্ত থেকে আসতো মানুষ। হরেক রকমের পসরা, শিশু-কিশোরদের নাগরদোলা, সার্কাসের আনন্দ আর সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক আয়োজন সব মিলিয়ে মেলাটি ছিল উপকূলীয় মানুষের প্রাণের মেলা। স্থানীয়দের কাছে এই মেলা এক গভীর আবেগের নাম।
কাছারীবাড়ী বৃক্ষমেলার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে এক বিশাল বটবৃক্ষের ইতিহাস। যে বটবৃক্ষের শীতল ছায়ায় দীর্ঘকাল ধরে জমে উঠতো মেলার মূল আড্ডা ও ঐতিহ্য, সেটি ছিল এই অঞ্চলের মানুষের আশ্রয় ও পরিচয়ের এক চিরচেনা স্মারক।
কিন্তু ২০১৯ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’-এর তাণ্ডবে শেকড়সুদ্ধ উপড়ে যায় ছায়াদানকারী সেই প্রকাণ্ড বটগাছটি। এর মধ্য দিয়ে মেলার বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে যায় দৃশ্যমান ঐতিহ্য। বটবৃক্ষটি আজ নেই, তবে স্থানীয়দের হৃদয়ে আজও সেই ছায়াঘেরা গাছটি জীবন্ত হয়ে আছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে থমকে যাওয়া কাছারীবাড়ী মেলার ইতিহাস এবারই প্রথম নয়। ২০০৯ সালের প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’র তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়ায় ২০০৯ ও ২০১০ সালে মেলা বন্ধ রাখতে হয়েছিল। তবে থামেনি এই জনপদ; ২০১১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর আবারও ফিরেছিল উৎসবটি।
দুর্যোগ ও প্রতিকূলতার গণ্ডি পেরিয়ে আবারও সাজ সাজ রব উত্তর বেদকাশীতে। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, হারানো স্মৃতি আর ঐতিহ্যের আমেজ ফিরিয়ে এনে এবারও উপকূলবাসীর মনে নতুন প্রাণের বার্তা দেবে এই কাছারীবাড়ী বৃক্ষমেলা।
মেলা পরিচালনা কমিটির সভাপতি সরদার মতিয়ার রহমান বলেন, কাছারীবাড়ী বৃক্ষমেলা শুধু চারা কেনাবেচার স্থান নয়, এটি আমাদের অঞ্চলের আবেগ ও ঐতিহ্যের প্রতীক। দীর্ঘ দুই বছর পর আবারও এই আয়োজন ফিরিয়ে আনতে পেরে আমরা আনন্দিত। প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমরা ঐতিহ্যবাহী বটবৃক্ষটি হারিয়েছি সত্য, কিন্তু পরিবেশ রক্ষার এই আন্দোলন থেমে থাকবে না। আশাকরি, সব ভেদাভেদ ভুলে সর্বস্তরের মানুষ এবারের মেলাকে সফল করে তুলবেন।
কয়রা থানার ওসি রাশেদুল আলম বলেন, ঐতিহ্যবাহী কাছারীবাড়ী বৃক্ষমেলা শুরু হচ্ছে। আনন্দের বিষয়- স্থানীয় সরকারি দল ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রেখে একসঙ্গে এই মেলা পরিচালনা করছেন। দশ দিনব্যাপী এই আয়োজন যাতে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশে সম্পন্ন হয়, সেলক্ষ্যে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিক পুলিশি নজরদারি ও টহল বহাল থাকবে।