সম্পাদকীয়
সংসারের অভাব ঘোচাতে বিদেশে পাড়ি জমানো আল-আমিনের স্বপ্ন ছিল খুবই স্বাভাবিক—পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো, সচ্ছল জীবন নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথেই নেমে আসে দুর্বিষহ বাস্তবতা।
মালয়েশিয়ায় যাওয়ার মাত্র দুই বছরের মাথায় তার দুটি কিডনিই বিকল হয়ে যায়। চিকিৎসা ও ডায়ালাইসিসের ব্যয় মেটাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে পরিবার। শেষ পর্যন্ত স্বজনদের কেউ কিডনি দিতে না পারায় নিজের একটি কিডনি স্বামীকে দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নেন স্ত্রী আসমা খাতুন। সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত এই ঘটনাটি নিঃসন্দেহে ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কিন্তু একই সঙ্গে এটি আমাদের সামনে রাষ্ট্র ও সমাজের একটি বড় দায়ও স্পষ্ট করে তোলে।
আসমার সিদ্ধান্তকে শুধু দাম্পত্য ভালোবাসার অসাধারণ প্রকাশ হিসেবে দেখলে ঘটনাটির গভীরতর দিকটি আড়ালে থেকে যাবে। একজন নারী যখন স্বামীকে বাঁচাতে নিজের শরীরের একটি অঙ্গ উৎসর্গ করতে বাধ্য হন, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে—একটি পরিবারকে কেন এমন চরম সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হবে? কেন দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয় একটি পরিবারকে নিঃস্ব করে দেবে? কেন একজন প্রবাসী শ্রমিক গুরুতর অসুস্থ হয়ে দেশে ফিরলে তার পরিবারকে চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হবে?
কিডনি রোগের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল। প্রতিস্থাপনের পরও রোগীকে নিয়মিত ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হয়। ফলে অস্ত্রোপচার সফল হলেই সংকট শেষ হয় না। আল-আমিনের পরিবার এখন যে নতুন আর্থিক চাপে পড়েছে, তা এই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। আজ তিনি বেঁচে আছেন, কিন্তু প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা চালিয়ে যেতে না পারলে সেই জীবনও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। তাই কিডনি প্রতিস্থাপনের মতো জটিল চিকিৎসাকে কেবল অস্ত্রোপচারের সাফল্য দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়; রোগীর পরবর্তী চিকিৎসা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বের দাবি রাখে। দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এসব মানুষ বিদেশে গিয়ে অসুস্থ হলে কিংবা কর্মক্ষমতা হারালে অনেক সময় পরিবারটি হঠাৎ করে আয়হীন হয়ে পড়ে। তাই প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য কার্যকর স্বাস্থ্যবীমা, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা এবং দেশে ফিরে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার সুযোগ আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। প্রবাসী কল্যাণ সংস্থা, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
একই সঙ্গে দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের কিডনি রোগীদের জন্য সরকারি সহায়তা বাড়ানো জরুরি। ডায়ালাইসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপনের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি প্রতিস্থাপনের পর প্রয়োজনীয় ওষুধ সহজলভ্য করা দরকার। শুধু চিকিৎসা অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না; অর্থের অভাবে যেন কোনো রোগী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন, সেই নিশ্চয়তাও দিতে হবে।
আসমা খাতুনের আত্মত্যাগ আমাদের আবেগাপ্লুত করে। কিন্তু এমন আত্মত্যাগ যেন অসহায়ত্বের শেষ আশ্রয় না হয়—সেটিই হওয়া উচিত সমাজ ও রাষ্ট্রের লক্ষ্য। একজন স্ত্রী স্বামীকে ভালোবেসে কিডনি দিতেই পারেন; কিন্তু একটি পরিবারকে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে নিঃস্ব হতে হবে কেন?
আল-আমিন-আসমার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা তাই শুধু ভালোবাসার গল্প নয়, এটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক নিরাপত্তার দুর্বলতারও আয়না। তাদের পাশে দাঁড়ানো যেমন মানবিক দায়িত্ব, তেমনি এমন সংকটে আর কোনো পরিবারকে যেন অসহায় হয়ে পড়তে না হয়—সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।