আসাদুজ্জামান সরদার
, সাতক্ষীরা
মেধাবী শিশু নুরজাহানের মুখের ভাষা নেই। সে কথা বলতে পারে না। সেজন্য মনের কথা ফুটিয়ে তোলে রং তুলির আঁচড়ে।
নুরজাহান সাতক্ষীরা শহরেরর রাজার বাগান এলাকার নুরুল গাজী এবং হামিদা বেগম দম্পতির সন্তান।
তার এক বছরের অর্জিত পুরস্কারের ক্রেস্ট, সার্টিফিকেট আর উপহার সামগ্রী রাখার জন্য আলাদা একটি শোকেস কিনতে হয়েছে বিধবা মা হামিদা বেগমকে। প্রথম শুনলে মনে হতে পারে কোনো বড় মাপের তারকার গল্প। কিন্তু না, এটি সাতক্ষীরার এক অদম্য মেধাবী শিশু নুরজাহানের কথা, যে একইসাথে বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী এবং ভয়াবহ অগ্নিসন্ত্রাসের শিকার। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আর আগুনের ক্ষত—কোনোকিছুই তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। ২০২৫-২৬ সেশনের আর্ট প্রতিযোগিতাগুলোতে তার জয়জয়কার বলে দিচ্ছে, সৃজনশীলতার কোনো সীমাবদ্ধতা নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবনঘেঁষা শ্যামনগরের টেংরাখালী গ্রাম থেকে ভাগ্য অন্বেষণে সাতক্ষীরা শহরে এসেছিলেন নুরজাহানের মা হামিদা বেগম। পরে রাজার বাগান সরকারি উত্তরপাড়ার নুরুল গাজীর সাথে তার বিয়ে হয়। বিয়ের কয়েক বছর পর স্বামী নুরুল গাজী মারা যাওয়ার পর এতিম সন্তানকে নিয়ে শুরু হয় তার জীবনযুদ্ধ। প্রতিবেশীর বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে চলে মা-মেয়ের অন্নসংস্থান। মেয়েকে নিয়ে ছোট একটি কুঁড়েঘরে বসবাস করছেন তারা।
নুরজাহানের মা হামিদা বেগম বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর এই মেয়েটিই একমাত্র অবলম্বন। ইশারায় কথা বললেও ওর ছবি আঁকার মধ্যে আমার সব স্বপ্ন খুঁজে পাই। ওর অর্জনগুলো রাখার জায়গা ছিল না বলে কষ্ট করে একটি শোকেস কিনেছি। ও যেনো ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, এটাই আমার চাওয়া।
তিনি আরো বলেন, পাঁচ বছর আগে যখন নুরজাহানের বয়স মাত্র চার কি পাঁচ, তখন প্রতিবেশী এক দুষ্কৃতকারী তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। পা থেকে কোমর পর্যন্ত পুড়ে গিয়ে ক্ষতবিক্ষত হলেও জীবনযুদ্ধে পরাজয় মানেনি। সে এখন সাতক্ষীরা হানিফ লস্কর বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলের শিক্ষার্থী।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইদ্রিস আলী বলেন, নুরজাহান আমাদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত। চরম প্রতিকূলতা এবং শারীরিক সীমাবদ্ধতা জয় করে সে যেভাবে শিল্পের মাধ্যমে নিজেকে মেলে ধরছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এমন প্রতিভাকে বিকশিত করতে নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে সকলের এগিয়ে আসা উচিত। একটু সমাদর আর সহযোগিতা পেলে এই মেয়েটি একদিন জাতীয় সম্পদ হয়ে উঠবে।
শিক্ষকের চোখে নুরজাহান
সুইড খাতিমুন্নেছা হানিফ লস্কর বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক এম রফিক বলেন, ও পড়াশোনার চেয়ে ছবি আঁকায় অনেক বেশি পারদর্শী। আড়াই-তিন বছর ধরে আমাদের স্কুলে আছে এবং ওকে ছবি আঁকা ও নাচের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর বা বাংলা নববর্ষের মতো জাতীয় দিবসগুলোতে জেলা প্রশাসন ও শিশু অ্যাকাডেমির চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় ও নিয়মিত অংশ নেয় এবং প্রতিবারই কোনো না কোনো পুরস্কার অর্জন করে। ওর হাতের কাজ সত্যিই বিস্ময়কর।
তিনি আরো বলেন, নুরজাহান আজ কেবল একজন প্রতিবন্ধী শিশু নয়, সে এক লড়াকু সত্তার নাম। অর্থকষ্ট আর শারীরিক ক্ষতকে পেছনে ফেলে সে যে স্বপ্নের পথে হাঁটছে, তাকে পূর্ণতা দিতে সমাজের বিত্তবান ও সরকারি সহযোগিতার দাবি করছি।