বিশেষ প্রতিনিধি
, যশোর
ফরিদা বেগম ওরফে টুনটুনির এখন বয়স প্রায় ৬৫ বছর। ৩০ বছরের মতো সময়কাল ধরে তিনি সকাল ও বিকেলে রাস্তার মোড়ে নিজের একটি ছোট্ট দোকানে বসে ভাজাপোড়া বানিয়ে তা বিক্রি করে আসছেন।
একনাগাড়ে দীর্ঘসময় ধরে পেঁয়াজু, চপ, সিঙাড়া, পুরি সুনামের সঙ্গে বিক্রি করে আসায় এলাকায় তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়। এমনকী স্থানীয়রা ওই মোড়টির নামও বদলে দিয়েছেন তার নামে। ওই মোড়টি ‘টুনটুনির মোড়’ হিসেবেই সর্বজন পরিচিত।
যশোর শহরতলীর শেখহাটি মোড়ে যে কারও কাছে জানতে চাইলে দেখিয়ে দেবে টুনটুনির মোড়। শেখহাটি বাবলাতলা থেকে তরফ নওয়াপাড়ায় পড়ে এই মোড়। তিন রাস্তার মোড়ে টিনের ছাউনি আর চাটাইয়ের বেড়া দিয়ে হালকা ঘেরা ফরিদা বেগমের এই ভাজাপোড়ার দোকান। দোকানের ভেতরে দুটো বড় খাট পাতা রয়েছে। সেখানেই বসে সকালে ডাল-পুরি আর বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খরিদ্দাররা নাশতা হিসেবে খেতে পারেন পেঁয়াজু, আলুর চপ, সিঙাড়া আর বেগুনি। যা-ই খান না কেন, প্রতিটির দাম পড়বে পাঁচ টাকা করে।
শুক্রবার বিকেলে টুনটুনির মোড়ে এই ভাজাপোড়ার দোকানে গিয়ে দেখা যায় অভাবনীয় দৃশ্য। দূর-দূরান্ত থেকে কেউ বাইসাইকেলে কিংবা রিকশায় অথবা মোটরসাইকেলে মোড়ে আসছেন। কেউ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে, কেউবা ভেতরে খাটের উপরে বসে অর্ডার দিচ্ছেন ভাজাপোড়ার এবং সেখানেই বসে খাচ্ছেন। আবার কেউবা পার্সেল নিয়ে যাচ্ছেন কাগজের ঠোঙা ভরে।
খাটের পরে বসে পেঁয়াজু আর বেগুনি খাচ্ছিলেন তানভীর নামে স্থানীয় এক যুবক। তিনি বলেন, ‘২০০০ সালের দিকে যখন আমি সেভেনে পড়ি, তখন থেকেই উনার তৈরি মুখরোচক এইসব খাবার খাই। এখনও খেয়ে যাচ্ছি।’
রহমত আলী নামে একজন শ্রমজীবী বলেন, ‘আমি এইখানে থাকি না। বাড়ি অন্য ইউনিয়নে। কিন্তু প্রায় ৮-৯ বছর এই অঞ্চলে উঠাবসা রয়েছে কাজের কারণে। চাচির কাছ থেকে রেগুলারই ভাজাপোড়া খাই, বাসার জন্যেও নিয়ে যাই।’
যশোর সদরের তরফ নওয়াপাড়া গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের স্ত্রী ফরিদা বেগম টুনটুনি। স্বামী গত হয়েছেন প্রায় আড়াই বছর। দুই ছেলে ও এক মেয়ের জননী টুনটুনি জানান, ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি এই মোড়ে ভাজাপোড়া তৈরি ও বিক্রি করেন। প্রথমদিকে পুরি, সিঙাড়া, চপ, পেঁয়াজুর দাম ছিল এক টাকা। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির কারণে পর্যায়ক্রমে দুই, তিন, চার এবং সবশেষ পাঁচ টাকা ধরা হয়েছে।
এতো বছর ধরে এই ব্যবসা করে কী করেছেন- জানতে চাইলে টুনটুনি বলেন, ‘কিছুই করিনি। আমি মানুষের সঙ্গে মিশতে, কথা বলতে পছন্দ করি। ঘরের ভেতরে থাকতে ভালো লাগে না। সেই কারণে টুকটাক লাভ হলেও এগুলো করছি শুধু মানসিক আনন্দের কারণে। কেননা সংসারে আমার কোনো খরচ দেওয়া লাগে না। দুই ছেলের সাথে শেয়ার করে থাকি। বউমা দুইজনও বেশ ভালো।’
প্রতিদিন সকাল ও বিকেল- এই দুই বেলা তিনি ভাজাপোড়া তৈরি ও বিক্রি করেন জানিয়ে টুনটুনি বলেন, “প্রতিদিন দুই কেজি পেঁয়াজের পেঁয়াজু, সাত কেজি আলু, দুই কেজি বেগুন, ছয় কেজি ময়দা, দুই কেজি খেসারির ডাল, ছয় কেজি সয়াবিন তেল আর জ্বালানির জন্যে ছয় কেজি খড়ি লাগে। এগুলো তৈরিতে, মসলা বানাতে দুই বউমা সহযোগিতা করে। দিনে দুই থেকে তিনশ’ টাকা লাভ হয়।”
স্থানীয়রা জানান, আগে এই মোড়টি ‘মন্টুর মায়ের আমতলা’ নামে পরিচিত ছিল। পরে টুনটুনির মোড় হিসেবে পরিচিতি পায়। মন্টু হচ্ছেন টুনটুনির দেবর, অর্থাৎ মোড়টি আগে টুনটুনির শাশুড়ির নামে পরিচিত ছিল। এই মোড়ে যে জায়গা, সেটি টুনটুনির শ্বশুরের। বর্তমানে টুনটুনি ও তাদের স্বজনররা সেখানেই বসবাস করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ফারুক হোসেন বাবু বলেন, যে সময় টুনটুনির এই ভাজাপোড়ার ব্যবসা নাম করেন, সেইসময় থেকেই মোড়ের নাম পাল্টে যায়। তা বছর বিশেক আগে তো বটেই।