যশোর, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

ইতিহাস

কলকাতা টু লন্ডনের সেই বাসরুট

জিয়াউদ্দিন সাইমুম

, ঢাকা

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৭ মে,২০২৬, ১০:০০ এ এম
কলকাতা টু লন্ডনের সেই বাসরুট

কলকাতা থেকে লন্ডন যেতে জাহাজ আর উড়োজাহাজই ছিল যখন ভরসা, তখনো স্থলপথে দূরত্বটি পাড়ি দেওয়া যেত বাসেও। ঊনিশশ’ পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে একটি নয়, দু-দুটি কম্পানির বাস যুক্ত করেছিল কলকাতা আর লন্ডনকে। এই দুটি বাসের নাম ছিল ‘ইন্ডিয়াম্যান’ আর ‘অ্যালবার্ট’। অ্যালবার্ট ছিল দোতলা বাস।

১৯৫৭ সালের ১৫ এপ্রিল লন্ডনের ভিক্টোরিয়া কোচ স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু ইন্ডিয়াম্যানের। বাসটি দিনের বেলায় চলতো, আর যাত্রীদের বিশ্রামের সুবিধার জন্য রাতে থামতো কোনো হোটেলে। ফ্রান্স, ইতালি, যুগোস্লাভিয়া, বুলগেরিয়া, তুরস্ক, ইরান এবং পাকিস্তান হয়ে ভারতে প্রবেশ করে ইন্ডিয়াম্যানের বাস। কলকাতায় এসে বাসটি পৌঁছেছিল জুন মাসের ৫ তারিখে। ফের কলকাতা থেকে যাত্রা করে একই বছরের ২ আগস্ট লন্ডনে পৌঁছেছিল ইন্ডিয়াম্যান। অসওয়াল্ড জোসেফ এবং গ্যারো ফিশারের তত্ত্বাবধানে চালু হওয়া এই বাস সার্ভিসটি সেসময় বেশ জনপ্রিয়ও হয়েছিল। ২০ জন যাত্রী নিয়ে প্রথম যাত্রা করে বাসটি। লন্ডন থেকে কলকাতা যেতে যাত্রীদের গুনতে হতো ৮৫ পাউন্ড, আর ফিরতি পথের ভাড়া ছিল ৬৫ পাউন্ড।

একই সময়ে লন্ডন-কলকাতা পথে চলতো অ্যালবার্ট নামে আরও একটি দোতলা বাস। সেই বাস সার্ভিসটি চালাতো অ্যালবার্ট ট্রাভেল নামে একটি প্রতিষ্ঠান। অ্যালবার্ট লন্ডন থেকে কলকাতা পর্যন্ত ১৫ বার এবং লন্ডন থেকে সিডনি পর্যন্ত চারবার যাতায়াত করেছিল বলে জানা যায়। মনে করা হয়, ইংল্যান্ড থেকে বেলজিয়াম হয়ে একে একে এই বাস পাড়ি দিতো জার্মানি, অস্ট্রিয়া, যুগোস্লাভিয়া, বুলগেরিয়া, তুরস্ক, ইরান, আফগানিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তান। ভারতে প্রবেশ করে নয়া দিল্লি, আগ্রা, এলাহাবাদ ও বেনারস হয়ে সবশেষে কলকাতায় পৌঁছাতো এই বাসটি। কন্ডাক্টেড টুরের মতো যাত্রাপথের অন্যান্য দ্রষ্টব্য স্থানও দেখতে পেতেন যাত্রীরা। এর ভাড়া ছিল অনেকটা বেশি, কিন্তু স্বাচ্ছন্দ্যও টেক্কা দিত ইন্ডিয়াম্যানকে। বাসটিতে ছিল লাউঞ্জ, রিডিং ররুম, ডাইনিং রুম, কিচেন। যাত্রীদের আরাম ও বিনোদনের জন্য স্লিপিং বাঙ্ক, হিটার, রেডিও ইত্যাদি বিবিধ ব্যবস্থা ছিল। লন্ডন থেকে কলকাতা আসতে যাত্রীদের খরচ পড়তো ১৪৫ পাউন্ড। তাঁদের ট্যাগলাইন ছিল- ‘ইওর কমপ্লিট হোম হোয়াইল ইউ ট্রাভেল’। অ্যালবার্টের যাত্রাপথই সে সময় পৃথিবীর দীর্ঘতম বাসরুট ছিল।

১৯৭৬ সাল পর্যন্ত লন্ডন-কলকাতা বাস সার্ভিস চালু ছিল বলে জানা যায়। কিন্তু এরপর বিশ্বরাজনীতির পট পরিবর্তন হতে থাকে। বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে জটিলতা ক্রমশ বাড়তে থাকে। অবশেষে নিরাপত্তার কথা ভেবে এই বাস সার্ভিস বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সেই সময়ের নিরিখে দারুণ আধুনিক ছিল বাসের সার্ভিস ব্যবস্থা। ছিল পড়ার সুবিধা, ঘুমানোর আলাদা বাঙ্ক, ফ্যানচালিত হিটার, রান্নাঘর, এমনকি, বাসের উপরের ডেকে ছিল ফরোয়ার্ড অবজারভেশন লাউঞ্জ! ছিল রেডিও এবং মিউজিক সিস্টেম।

তেহরান, সালজবার্গ, কাবুল, ইস্তাম্বুল এবং ভিয়েনায় কেনাকাটার অনুমতি দেওয়া হতো পর্যটকদের। উত্তর ভারত ঘুরে দেখার সময়ও দেওয়া হতো তাদের। যমুনাতীর, তাজমহল, বেনারসসহ ভারতের পর্যটন-গন্তব্যে সময় কাটানোর জন্য সময় দেওয়া হতো। অ্যালবার্ট ট্রাভেল কোম্পানি কলকাতা থেকে লন্ডন এবং লন্ডন থেকে সিডনি পর্যন্ত এই বাসটির প্রায় ১৫টি ট্রিপ সম্পন্ন করেছিল! ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ায় ১৯৭৬ সালে বাস সার্ভিসটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডন থেকে ভারতের কলকাতা পর্যন্ত এই বাসটি ২০ হাজার ৩০০ মাইল দূরত্ব অতিক্রম করতো। সম্প্রতি লন্ডনের ভিক্টোরিয়া কোচ স্টেশনের ১৯৬০-এর দশকের ছবি অনলাইনে ভাইরাল হয়েছে। ছবিটি বিশ্বের দীর্ঘতম এই রুটের যাত্রীরা বাসে উঠার পূর্বে ক্যামেরাবন্দী করা হয়।

তখন ১১টি দেশের মধ্য দিয়ে বাসটি চলাচল করতো। এই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করা বাসটির নাম ছিল ‘আলবার্ট’। এটি একটি বিলাসবহুল ডাবল ডেকার ছিল।

১৯৬৮ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত ১৫ বার লন্ডন থেকে কলকাতা যাতায়াত করেছিল বাসটি। আর লন্ডন থেকে কলকাতা হয়ে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি পর্যন্ত যাতায়াত করেছিল চার বার। কলকাতা থেকে লন্ডন পর্যন্ত যাওয়ার জন্য ভাড়া ছিল ৮৫ পাউন্ড। ভারতীয় মুদ্রায় সাত হাজার ৮৮৯ রুপির সমান ছিল; যা বাস যাত্রার ক্ষেত্রে খুবই ব্যয়বহুল ছিল। আলবার্ট ১৯৪৭ সালে নির্মিত একটি এলবিন ডাবল ডেকার বাস। পরবর্তী সময় এটি মেরামত করে একটি বিলাসবহুল বাসে রূপান্তর করা হয়।

ব্রিটিশ পর্যটক অ্যান্ডি স্টুয়ার্ট ১৯৬৮ সালের মে মাসে বাসটি কিনে নেন। এরপর তিনি এটি নিজের ভ্রাম্যমাণ বাড়ি ও গাড়ি হিসেবে গড়ে তোলেন। স্টুয়ার্ট এরপর একটি অভিনব পরিকল্পনা করেন। তিনি বাসে চড়ে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে লন্ডনে নিজ বাড়ি যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। এই দীর্ঘ পথ তিনি একাকী না গিয়ে সঙ্গে কয়েকজন যাত্রী নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিনি ১৩ জন যাত্রী নিয়ে সিডনি থেকে রওনা দিয়ে ভারত হয়ে লন্ডনে পৌঁছান। এই যাত্রায় তিনি ১৬ হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছিলেন। ১৩২ দিনের দীর্ঘ যাত্রা শেষে ১৯৬৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাসটি লন্ডন পৌঁছায়। এরপর বাসটি আরও ১৪ বার এই দীর্ঘতম রুটে যাত্রা করে। ভারত থেকে বার্মা, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের মধ্য দিয়ে জাহাজ কিংবা ফেরিতে পার হয়ে অস্ট্রেলিয়ার পথে প্রবেশ করতো এটি।

আলবার্ট যেসব দেশ পেরিয়ে আসতো, সবার কাছে সে ‘বন্ধু-দূত’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। ১৯৭৬ সালে ইরানে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি এবং অবরুদ্ধ হলে বাস সার্ভিসটি বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় পর ২০১২ সালে বাসটি অস্ট্রেলিয়ায় ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। তবে তখন আর এটি ব্যবহার উপযোগী ছিল না।

কলকাতা, লন্ডন এবং সিডনি জুড়ে অ্যালবার্টের যাতায়াতের জন্য একটি বছরব্যাপী সময়সূচিও তৈরি করা হয়েছিল সেই সময়। সেইমতো ৪, ৫, ৬, ৭, ৮ এবং ৯ নম্বরের ট্রিপগুলো চলতো লন্ডন থেকে সিডনি পর্যন্ত আর ১২ থেকে ১৫ নম্বরের ট্রিপগুলোর যাত্রা শেষ হতো কলকাতাতেই।

এই অ্যালবার্ট ট্যুরের তৎকালীন একটি বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল, ‘বাসের মধ্যেই পাবেন যাত্রার স্বাধীনতা। হোটেল, ক্যাম্পসাইট, প্রতিকূল আবহাওয়া- সবকিছু থেকেই স্বাধীনতা।’ এই অ্যালবার্ট বাস সত্যিই স্বপ্নের মতো ছিল। চাইলেই কেউ অনায়াসে বাসের ছাদে বসে খানিক অন্যরকম সময় কাটাতে পারতেন। বাসের নিচের ডেকে ছিল একটি পড়ার ঘর এবং একটি খাওয়ার ঘর। এমনকি বিলাসবহুল এই বাসের উপরের ডেকে বসে সামনের দৃশ্য উপভোগ করার মনোরম সুযোগও ছিল। এছাড়াও ছিল সমস্ত সুযোগসুবিধা দিয়ে সাজানো একটি রান্নাঘর। রেডিও, টেপ ইত্যাদি একাধিক সংগীতযন্ত্রের আয়োজন ছিল এই ‘অ্যালবার্ট’-এর মধ্যে। কিংবা যাত্রাপথে যাত্রীদের সুবিধার্থে এই বাসে হিটারের ব্যবস্থাও ছিল। এগুলো ছাড়াও বাসের ভিতরের সাজও ছিল নজরকাড়ার মতো। উজ্জ্বল পর্দা, ঘুমের জন্য আলাদা ব্যবস্থা, কার্পেট সব মিলিয়ে এলাহি আয়োজন।

ইংল্যান্ড থেকে কলকাতার পথে পাড়ি দিয়ে একে একে ইস্তাম্বুলের গোল্ডেন হর্ন, পুরানো দিল্লি, আগ্রার তাজমহল, গঙ্গার বেনারস, ক্যাস্পিয়ান সাগর উপকূল, ব্লু দানিউব, ড্রাকোনিয়ান পাস, রাইন ভ্যালি, খাইবার পাস কিংবা কাবুল গিরিখাতের মতো অজস্র অসাধারণ জায়গাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে আসতো অ্যালবার্ট। এছাড়াও বাড়তি পাওনা হিসেবে এই প্যাকেজে বরাদ্দ ছিল নতুন দিল্লি, কাবুল, ইস্তাম্বুল, তেহরান, ভিয়েনা, সালজবার্গ ইত্যাদি আরো অনেক জায়গায় বিনামূল্যে কেনাকাটা করার সুযোগও।

কয়েক বছর চুটিয়ে যাতায়াত করার পর আকস্মিক এক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে বাসটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তার কিছু পরে অ্যান্ডি স্টুয়ার্ট নামে এক ব্রিটিশ পর্যটক এই বাসটি কিনে নেন। পরবর্তীকালে তিনি এটিকে একটি ‘ডবল-ডেকার মোবাইল হোম’ হিসেবে পুনর্নির্মাণ করেছিলেন, যা আবার পরবর্তী যাত্রার সূচক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। ১৯৬৮ সালের ৮ অক্টোবর আবারো সিডনি থেকে লন্ডন হয়ে ভারতের পথে নতুন করে যাত্রা শুরু করে ডবল ডেকার বাসটি। ‘সেন্ট্রাল ওয়েস্টার্ন ডেইলি’-র একটি প্রতিবেদন অনুসারে, স্টুয়ার্ট ১৩ জন সহযাত্রী নিয়ে সিডনির মার্টিন প্লেস থেকে শুরু করেছিলেন প্রায় ১৬ হাজার কিলোমিটার পথের এই যাত্রা। ১৩২ দিন পর, ১৯৬৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে আসেন তিনি। অ্যালবার্ট ট্যুরস ছিল ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার এমন একটি কম্পানি যেটি লন্ডন-কলকাতা-লন্ডন এবং লন্ডন-কলকাতা-সিডনি রুটে যাতায়াত করতো।

১৯৭৬ সাল পর্যন্ত, এতোদিনের যাত্রার এই সঞ্চয় বলতে ছিল প্রায় ১৫০টি দেশের সীমানা ছুঁয়ে আসার মতো অসাধারণ অভিজ্ঞতা আর ছিল নানা দেশ থেকে পাওয়া নতুন শিরোপা, ‘ফ্রেন্ডলি অ্যাম্বাসাডর’।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)