যশোর, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

খানাদানা

খিচুড়ির বৈশ্বিক রূপ

জিয়াউদ্দিন সাইমুম

, ঢাকা

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৫ মে,২০২৬, ১০:০০ এ এম
খিচুড়ির বৈশ্বিক রূপ

মনসামঙ্গল কাব্যে স্বয়ং শিব যে খাবারটির আবদার পার্বতীর কাছে জানিয়েছিলেন, তা হলো ‘বৈসাদৃশ্যময় উপকরণে তৈরি মিশ্র খাদ্য’ অর্থাৎ খিচুড়ি। খাদ্যরসিক বাঙালির বর্ষাকাল মানেই খিচুড়ির কাল। বৃষ্টি পড়লেই বাঙালি-বাড়িতে যখন-তখন বদলে যেতে পারে মেনু। তুমুল বা ঝিরঝিরে, বৃষ্টির সঙ্গে খিচুড়ির এবং খিচুড়ির সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক আজও অটুট। বলা হয়ে থাকে, বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদৌলা থেকে শুরু করে বিবেকানন্দ পর্যন্ত মহারথীরা খিচুড়ির প্রেমে হাবুডুবু খেতেন। বিবেকানন্দের ‘পেটুক সংঘের’ গবেষণার একটি বিষয় ছিল, ‘খিচুড়ি রাঁধবার নতুন পথ’। বিখ্যাত সাহিত্যিক শঙ্কর বলেছেন, ‘ওয়ার্ল্ডের সেরা খিচুড়ি তৈরি হয় বেলুড়মঠে’।

চৈতন্যদেবের খিচুড়ি খুবই প্রিয় ছিল। এখনো তাঁর মহাভোগ বলতে খিচুড়িই বোঝায়। পুরীর জগন্নাথদেবের মন্দিরে প্রসাদ হিসেবে ভক্তদের যে খিচুড়ি বিতরণ করা হয়, তা লোকমুখে সংক্ষেপে ‘জগাখিচুড়ি’ নামে পরিচিত। যা কথ্যভাষায় আবার তালগোল পাকানোর প্রতিশব্দ। কাশ্মীরি পণ্ডিতেরা যক্ষদেবতা কুবেরকে খিচুড়ি ভোগ উৎসর্গ করেন, যার নাম ‘খেতসিমাভাস’। তামিলনাড়ুতে খিচুড়িকে ‘পোঙ্গল’ বলে। রাজস্থানে যে হালকা খিচুড়ি রান্না হয়, তাকে ‘তেহরি’ বলে। মহারাষ্ট্রে খিচুড়ির সাথে মেশানো হয় শর্ষে দানা।

খিচুড়ির ইতিহাস বলছে, এ খাবারের উৎস অবিভক্ত বাংলা নয়। গ্রিকদূত সেলুকাস উল্লেখ করেছেন, তখন ভারতীয় উপমহাদেশে চালের সঙ্গে ডাল মেশানো খাবার খুবই জনপ্রিয় ছিল। আলবিরুনিও তাঁর ভারততত্ত্বে খিচুড়ির প্রসঙ্গ বাদ দেননি। মরক্কোর বিখ্যাত পর্যটক ইবন বতুতা খিচুড়ি তৈরিতে নির্দিষ্ট করে মুগডালের কথাও বলেছেন। সপ্তদশ শতকে ভারত ভ্রমণকালে ফরাসি পরিব্রাজক টেভার্নিয়ের লিখেছেন, সে সময় ভারতে প্রায় সব বাড়িতেই খিচুড়ি খাওয়ার রেওয়াজ ছিল।

গ্রিক পরিব্রাজক মেগাস্থিনিসও চাণক্যের মতোই চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যরে রাজসভার রান্নাঘরে চাল ও ডাল মিশিয়ে খিচুড়ি তৈরির কথা শুনিয়েছেন। পঞ্চদশ শতকে এ দেশে এসেছিলেন রাশিয়ান পর্যটক আফনাসিই নিকতিন। সুস্বাদু খিচুড়ি তাঁর চোখও এড়াতে পারেনি।

মুগল সম্রাট আকবরের মন্ত্রী আবুল ফজল তাঁর ‘আইন-ই-আকবরী’তে নানা ধরনের খিচুড়ি তৈরির কথা বলেছেন। খিচুড়ির প্রতি ভালোবাসা ছিল জাহাঙ্গীরেরও। তাতে মিশতো পেস্তা ও কিসমিস, ভালোবেসে নাম রেখেছিলেন ‘লাজিজাঁ’ বা ‘লাজিজান’। সম্রাট আওরঙ্গজেবের প্রিয় ‘আলমগিরি’তেও খিচুড়ির কথা রয়েছে। তবে এই খিচুড়িতে চাল, ডালের সঙ্গে মেশানো হতো বিভিন্ন প্রকার মাছ ও ডিম। রাজকীয় খাবার হিসেবে হায়দরাবাদের নিজামের রান্নাঘরেও খিচুড়ি জনপ্রিয় হয়েছিল। সেই খিচুড়ির ভাঁজে ভাঁজে থাকতো সুস্বাদু মাংসের কিমা। ১৯ শতকের ভিক্টোরিয়ান যুগে দেশে ফেরত ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের হাত ধরে তা ইংল্যান্ডে পৌঁছায়। পরবর্তীকালে এই খিচুড়ি ব্রিটিশ-রসনা মিশ্রিত হয়ে জনপ্রিয় ইংলিশ প্রাতঃরাশ ‘কেডগেরি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। কেডগেরিতে থাকে মাছ, কেইন পিপার ও সেদ্ধ ডিম।

এদিকে মোটামুটি ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি মিশরীয়দের মধ্যে ‘কুশারি’ নামে একটি পদ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এটি তৈরি হতো চাল, ডাল, চানা, ভিনিগার, টমেটো সস, পেঁয়াজ, আদা, রসুন প্রভৃতি উপকরণ দিয়ে। কুশারিকে খিচুড়ির ভিন্নরূপ বলা যেতে পারে। বলা হয়ে থাকে, ১২০০-১৮০০ সালের মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে বাংলায় খিচুড়ির আবির্ভাব। হালে বাংলাদেশের খিচুড়িতে মিশে আছে বৃষ্টিদিনের রোমান্টিসিজম। অথবা বলা যেতে পারে: বর্ষা, বাঙালি আর খিচুড়ি যেন এক সুতোয় বাঁধা।

অঞ্চলভেদে খিচুড়ির বিভিন্ন আঞ্চলিকরূপ পরিলক্ষিত হয়। যেমন নরম খিচুড়ি, ভুনা খিচুড়ি, মাংস খিচুড়ি, নিরামিষ খিচুড়ি, মুগডালের খিচুড়ি, সবজি খিচুড়ি, মুসুর ডালের খিচুড়ি, গমের খিচুড়ি, সাবুর খিচুড়ি, মাংসের খিচুড়ি, ডিমের খিচুড়ি, মাছের খিচুড়ি ইত্যাদি।

ধারণা করা হয় বাংলা খিচুড়ি শব্দটি সংস্কৃত খিচ্চা থেকে এসেছে। অঞ্চলভেদে শব্দটির তৃতীয় ব্যঞ্জনবর্ণের উচ্চারণ ও ব্যবহারে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। বাঙালি পরিমণ্ডলে ‘খিচুড়ি’ উচ্চারণ করা হলেও কোথাও কোথাও ‘খিচুরি’ বলতে শোনা যায়। হিন্দিভাষীরা ‘ড়’ এবং উর্দুভাষীরা ‘র’ ব্যবহার করে থাকেন খিচুড়ি উচ্চারণে। তবে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ বলছে, প্রাকৃত শব্দ ‘কিসর’ বা ‘কৃসরা’ থেকে ক্রমান্বয়ে খিচরি (রী/ড়ি/ড়ী) হয়ে আজকের অপভ্রংশ এই খিচুড়ি শব্দের বিবর্তন।

মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য মনসামঙ্গলে শিব পার্বতীকে ডাবের পানি দিয়ে মুগডালের খিচুড়ি রান্নার ফরমায়েশ দিচ্ছেন। অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘আদা কাসন্দা দিয়া করিবা খিচুড়ি’। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশে ডালের ব্যবহার ততো প্রাচীন নয়। নীহাররঞ্জন রায় তার ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘প্রাচীন বাঙালীর খাদ্য তালিকায় ডালের উল্লেখ কোথাও দেখিতেছি না’।

এটা ঠিক, ডাল ভারতীয় শস্য নয়। ডালের আদি ঠিকানা মধ্যপ্রাচ্য। সেখান থেকে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তান দিয়ে উত্তর ভারত হয়ে বাংলায় আসে ডাল। তখন মধ্যযুগ। মধ্যযুগ বলতে ১২০০ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যবর্তী কোনও এক সময়ের কথা বলা হচ্ছে। অতএব তখন থেকেই খিচুড়ির আবির্ভাব। নীহাররঞ্জন রায় জানাচ্ছেন, উচ্চবিত্ত লোকেরা তখন আহারের শেষের দিকে ডালের স্বাদ আস্বাদন করতেন। তখন মাছ সহজলভ্য হওয়ায় গরিবকে ডালের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হতো না।

বাবর বা হুমায়ুনের কালে খিচুড়ির উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে আকবরের সময় থেকে মুগল হেঁশেলে খিচুড়ির উল্লেখ মিলতে থাকে। বোঝা যাচ্ছে, এদেশে খিচুড়ির বয়স খুব বেশি নয়।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন