পোশাক
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
, ঢাকা
জোব্বা এমন একটি পোশাক যা বিশ্বে থুব, দেশদাশা, বা কন্দুরা নামেও পরিচিতি পেয়েছে। এটি হলো দীর্ঘ-হাতা গোড়ালি-দৈর্ঘ্য ঐতিহ্যবাহী আরব পোশাক। এটি প্রধানত মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার কিছু দেশে পুরুষরা পরিধান করেন। কিন্তু পোশাকটি নারীপুরুষনির্বিশেষে পরা যায়। কারণ এটি নিরপেক্ষ পোশাক।
কিন্তু নাম এবং শৈলীতে আঞ্চলিক ভিন্নতা রয়েছে। স্থানীয় ঐতিহ্যের উপর নির্ভর করে এটি আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক পরিবেশে পরিধান করা যেতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে জোব্বা হলো পুরুষদের প্রধান আনুষ্ঠানিক পোশাক। জোব্বার শালীন চেহারার কারণে উপমহাদেশের মুসলিম পুরুষরাও এটা পরিধান করেন।
জোব্বার সমগোত্রীয় জেলাবিয়াও একটি ঐতিহ্যবাহী পোশাক, যা মূলত মিশর ও সুদানে পরিধান হয়। কিন্তু এটা জোব্বা থেকে আলাদা। কারণ জেলাবিয়া চওড়া কাটা কাপড়, কোনো কলার নেই (কিছু ক্ষেত্রে বোতামও নেই) এবং লম্বা, চওড়া হাতা।
সৌদি আরব, ইয়েমেন, বাহরাইন, কাতার, ফিলিস্তিনে জোব্বা ‘ছওব’ নামেই পরিচিত। আবার সিরিয়া, ইরাক, কুয়েত, ওমান, খুজেস্তান, হাজরামাউতে এটা ‘দেশদাশা’ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়ায় এটি কন্দুরা বা গন্দুরা নামে পরিচিত। অন্যদিকে মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় (বাংলা, দরি, দক্ষিণী, মালয়, পশতু, উর্দু ভাষায়) এটাকে জুব্বা বা জোব্বা, জিব্বা ও জুবাহ নামে ডাকা হয়।
এটি সাধারণত পলিয়েস্টার ফ্যাব্রিক দিয়ে তৈরি করা হয়। তবে ভেড়ার পশমের মতো ভারী উপকরণও ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষ করে লেবাননের ঠান্ডা আবহাওয়ায়। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোতে জোব্বা সাধারণত সাদা বা বেইজ পলিমার কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়, শীতের মাসগুলোতে রঙিন উলের জোব্বা পরা হয়। জোব্বা সাধারণত আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য উপযুক্ত পোশাক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জোব্বা একটি জনপ্রিয় ফ্যাশন আইটেম হয়ে উঠেছে, অনেক ফ্যাশন ডিজাইনার ঐতিহ্যবাহী পোশাকে তাদের নিজস্ব আধুনিক টুইস্ট যুক্ত করেছেন।
ফ্যাশনবিদরা মনে করছেন, উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে, জোব্বার হাতা এবং কলারগুলোকে আরো আনুষ্ঠানিক লুক দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। জোব্বার সামনের অংশে পকেট এবং অ্যামব্রয়ডারি যোগ করা যেতে পারে এবং প্যাকেট বোতামগুলোকে ঢেকে, উš§ুক্ত করা বা জিপার দ্বারা প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানে, পুরুষদের জোব্বাতে কোনো কলার নেই, ফ্রগ ক্লোজারগুলোকে প্যাকেট ফাস্টেনার হিসেবে ব্যবহার করে এবং ট্যাসেল অন্তর্ভুক্ত করে। ওমানে ট্যাসেলগুলো ছোট হতে থাকে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ট্যাসেলগুলো কোমর পর্যন্ত প্রসারিত হয়।
ইসলামি স্কলাররা বলেন, জোব্বা নবী (সা.) পরেছেন, সাব্যস্ত হয়েছে। সুতরাং কেউ যদি নবী (সা.) পরেছেন, এই জন্য পরেন, তাহলে তিনি সওয়াব পাবেন কোনো সন্দেহ নেই। নবী (সা.) বিভিন্ন ধরনের জোব্বা পরেছেন, ইয়েমেনি জোব্বা পরেছেন, রোমি জোব্বা পরেছেন, সুস্পষ্ট হাদিসের মাধ্যমে সাব্যস্ত হয়েছে। সুনানে তিরমিজি, সুনানে নাসাঈর মধ্যে হাদিসটি রয়েছে, একাধিক হাদিসের কিতাবের মধ্যে এই মর্মে হাদিস রয়েছে। তাই যদি কেউ নবী (সা.) পরেছেন এ কারণে জোব্বা পরেন, তাহলে তিনি নবী (সা.)-এর আমলের কারণে সওয়াব পাবেন, শুধু জোব্বা পরার কারণে নয়।
কারণ পোশাক পরিচ্ছদগুলো কিন্তু নবী (সা.)-এর স্বভাবগত আমলের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত, অর্থাৎ আদাতের (এলাকার প্রথা-প্রচলন) মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এগুলো সরাসরি তাআব্বুদিবা বা ইবাদত সংশ্লিষ্ট বিষয় নয়। যে বিষয়গুলো ইবাদত-সংশ্লিষ্ট বিষয় না, সেগুলোর ওপর শরিয়তের বিধান সুন্নাত অর্থে প্রয়োগ করা বৈধ নয়, কারণ এগুলো আদাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয়। কিন্তু যে বিষয়গুলো তাআব্বুদি, সেগুলো রাসুল (সা.) করেছেন প্রমাণিত হলেই সুন্নাহ সাব্যস্ত হবে।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল হ্যারল্ড রিচার্ড প্যাট্রিক ডিকসন ১৯২০ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে একজন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসক ছিলেন এবং কুয়েতের উপর বেশ কিছু বই লিখেছেন। তিনি ‘দি অ্যারাব অব দি ডেজার্ট’ গ্রন্থে লিখেছেন: ‘বেদুইন নারীরা মরুভূমিতে তাদের তাঁবুর সাথে খুঁটিতে একটি রঙিন জোব্বা ঝুলিয়ে রাখেন। এর মাধ্যমে তারা কোনো পথিক বা বিশিষ্ট ব্যক্তিকে তাদের অতিথি হবার জন্য আমন্ত্রণ জানান।’
জোব্বা আন্তর্জাতিক মিডিয়ারও মাঝে মাঝে দৃষ্টি কাড়ে। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভে ডেমোক্রেট সদস্য রাশিদা তায়িব (ফিলিস্তিনি-আমেরিকান নারী) জোব্বা পরিধান করে শিরোনাম হয়েছিলেন। আর ২০২২ বিশ্বকাপে কাতারের ‘ঘুতরা’ জোব্বা বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল বৈশ্বিক মিডিয়ায়।