যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সিন্ডিকেটের থাবায় লোপাট কৃষকের ৭৫ কোটি টাকা!

আসাদুজ্জামান সরদার

, সাতক্ষীরা

প্রকাশ : বুধবার, ২৯ এপ্রিল,২০২৬, ১২:০০ পিএম
সিন্ডিকেটের থাবায় লোপাট কৃষকের ৭৫ কোটি টাকা!

বোরো ধানের বাম্পার ফলনও হাসি ফোটাতে পারছে না কালিগঞ্জের কৃষকের মুখে। ঘাম ঝরানো ফসলের ন্যায্য প্রাপ্তি এখন এক অদৃশ্য ‘প্রাতিষ্ঠানিক শিকলে’ আটকা পড়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সারের কৃত্রিম সংকট ও ধানের বাজার নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। চলতি মৌসুমে উপজেলার প্রান্তিক চাষিদের পকেট থেকে তারা হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি ৬৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা। সরকারি দরের চেয়ে সারে অতিরিক্ত ব্যয় এবং ধান বিক্রিতে লোকসান- এই দ্বিমুখী চাপে এখন দিশেহারা কালিগঞ্জের হাজারো কৃষক।

অভিযোগ উঠেছে, এই বিশাল অঙ্কের ‘গণলুটপাটের’ নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন খোদ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওয়াসিম উদ্দীন। তার রহস্যজনক নির্লিপ্ততা এবং সিন্ডিকেট তোষণ কৃষকদের খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

হিসাবের গোলকধাঁধাঁ

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর কালিগঞ্জে ৭ হাজার ২৫৮ হেক্টর (প্রায় ৫৪ হাজার ২৫৩ বিঘা) জমিতে ধান চাষ হয়েছে। বিঘাপ্রতি সর্বনিম্ন ২২ মণ (৮৮০ কেজি) ফলন হিসেবে মোট উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় চার কোটি ৭৭ লাখ ৪২ হাজার ৬৪০ কেজি। সরকারনির্ধারিত কেজিপ্রতি ৩৬ টাকা দরে যার বাজারমূল্য ১৭১ কোটি ৮৭ লাখ ৩৫ হাজার ৪০ টাকা।

কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সিন্ডিকেটের কারসাজিতে কৃষক প্রতিকেজি ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন মাত্র ২৫-২৬ টাকায়। ফলে, কেবল ধান বিক্রি থেকেই কৃষকের লোকসান হয়েছে ৪৮ কোটি ৫০ লাখ ৬৫ হাজার ২২২ টাকা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সারের কৃত্রিম সংকট। বিঘাপ্রতি গড়ে ৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত সার খরচ চাপিয়ে কৃষকের পকেট থেকে আরও ২৭ কোটি ১২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ডিলাররা। সব মিলিয়ে কালিগঞ্জের কৃষি অর্থনীতিতে প্রায় ৭৫ কোটি টাকার এক ভয়াবহ ধস নামানো হয়েছে।

ডিলারদের ‘জিম্মি’ পদ্ধতি, কৃষকের আর্তনাদ

উপজেলায় বিএডিসির ও বিসিআইসির ২৪ জন ডিলার এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ৮৫ জন সাব-ডিলারসহ মোট ১০৯ জন ডিলারের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এই বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।

মথুরেশপুর ইউনিয়নের কৃষক ফরিদ তরফদার আক্ষেপ করে বলেন, বস্তায় ৪৫০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনেছি। রশিদ চাইলে ডিলার বলে-নিলে নেন, না নিলে বিদেয় হন।

একই অভিযোগ ধলবাড়িয়া ইউনিয়নের আব্দুর রহিমের। তিনি বলেন, আমরা রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে ফসল ফলাই, আর কর্মকর্তারা এসি রুমে বসে সিন্ডিকেটের ভাগ নেন।

কুশুলিয়া ইউনিয়নের নজরুল ইসলাম জানান, তিন বস্তা সারে তাকে দেড় হাজার টাকা অতিরিক্ত দিতে হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে ফসলের উৎপাদন খরচে।

মাঠে নেই কৃষি কর্মকর্তা, ক্ষুব্ধ জনপ্রতিনিধি

কৃষকদের অভিযোগ, সারের সরকারি দাম কত বা ধানের রোগবালাই প্রতিকারের উপায় কী-তা জানাতে কোনো কৃষি কর্মকর্তাকে মাঠে পাওয়া যায় না। এই অনুপস্থিতিকে ‘পরিকল্পিত অপরাধ’ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।

বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পরিষদের মিটিংয়ে বারবার সারের বাড়তি দাম নিয়ে বললেও কৃষি কর্মকর্তা গুরুত্ব দেন না। তিনি ডিলারদের সাথে গোপন বৈঠক করেন অথচ কৃষকদের কথা শোনেন না।

উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। সারের দাম নিয়ে ডিলার ও কর্মকর্তার বক্তব্যের কোনো মিল নেই। এসব দেখার দায়িত্ব যার, তিনি পুরোপুরি নির্লিপ্ত।

কৃষি কর্মকর্তার ‘ওপর মহলের’ দাপট

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওয়াসিম উদ্দীন সাংবাদিকদের সাথে অত্যন্ত রুক্ষ আচরণ করেন। তিনি বলেন, বাজারে কোনো সংকট নেই, কৃষকরা অতিরঞ্জিত কথা বলছে।

২০২২ সাল থেকে একই কর্মস্থলে থাকা এই কর্মকর্তা দম্ভোক্তি করে বলেন, বদলির ভয় দেখিয়ে লাভ নেই, ওপর মহলে আমার হাত অনেক লম্বা।

এদিকে, সাতক্ষীরা জেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলামের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি কোনো সদুত্তর দেননি। তবে, তিনি দাবি করেন, কৃষকরা সরকারি দামেই সার কিনছেন ও ধান বিক্রি করছেন। কোথাও কোনো সমস্যা নেই।

প্রশাসনের নাকের ডগায় চলা এই প্রকাশ্য লুটপাটে কালিগঞ্জের কৃষি অর্থনীতি এখন ধ্বংসের মুখে। কৃষকদের দাবি, অবিলম্বে এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে তাদের জীবন রক্ষা করা হোক।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)