সৈয়দ শাহ মোস্তফা হাসমী
, যশোর
যশোরে মেডিকেল কলেজের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০১০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর। অথচ আজ পর্যন্ত কলেজটিতে কোনো হাসপাতাল তৈরি হয়নি। যদিও ‘মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজ আইন’ অনুযায়ী মেডিকেল কলেজের সঙ্গে হাসপাতাল স্থাপন বাধ্যতামূলক।
মেডিকেল কলেজের সঙ্গে হাসপাতালের যোগসূত্র প্রধানত দুটি কারণে। প্রথমত, শিক্ষার্থীরা হাতেকলমে শিক্ষার সুযোগ লাভ করবেন এখান থেকে। দ্বিতীয়ত, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মূল চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শিক্ষকরা। ফলে তাদের কাছ থেকে সন্নিহিত এলাকার রোগীরা সর্বোত্তম চিকিৎসা সেবা পেয়ে থাকেন।
যশোর সরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের পর কুষ্টিয়া ও সাতক্ষীরায় অনুরূপ প্রতিষ্ঠান গড়ে সরকার। এই দুই জেলায় বেশ আগেই কলেজের সঙ্গে হাসপাতাল স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের অনীহা, দায়িত্বহীনতা, সরকার সমর্থক চিকিৎসকদের কোন্দল প্রভৃতি কারণে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্থাপনে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়। অবশেষে যশোরসহ আশপাশের এলাকার মানুষের প্রাণের এই দাবিটি পূরণ হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র আড়াই মাসের মাথায় যশোর মেডিকেল কলেজে ৫০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হচ্ছে আজ সোমবার। সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বয়ং এই ভিত্তি স্থাপনের মাধ্যমে অবহেলিত যশোর অঞ্চলের চিকিৎসা সেবা বৃদ্ধির যুগান্তকারী কাজটি করছেন।
প্রতিষ্ঠা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
২০০৬ সালে তখনকার প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যশোরে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া এই কাজ শুরু করার সুযোগ পাননি। রাজনৈতিক অস্থিরতায় সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা দুরূহ হওয়ার পাশাপাশি তার সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে হয়ে যায়। পরে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের জানুয়ারির শেষের দিকে শহরতলীর বিলহরিণায় মেডিকেল কলেজের জন্যে ২৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ২০০৮ সালে এখানে ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক ভবন নির্মাণকাজ শুরু হয়। স্বাস্থ্য অধিদফতর ২০১০ সালের মার্চ মাসে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্যে ফ্যাকাল্টি অনুমোদন দেয়। কিন্তু ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন না হওয়া এবং কলেজের সাথে হাসপাতাল না থাকায় ২০১০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর যশোর জেনারেল হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটের দ্বিতীয় তলায় মাত্র ৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ২০১৩ সালের শেষের দিকে মেডিকেল কলেজের অ্যাকাডেমিক ভবন নির্মাণ কাজ শেষ হয়। সে সময় রাজনৈতিক প্রভাব ও সরকার সমর্থক স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের নেতাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে হাসপাতাল নির্মাণ কার্যক্রম দীর্ঘ সময় স্থবির হয়ে ছিল। রাস্তার অজুহাত দেখিয়ে নিজস্ব ক্যাম্পাসে কার্যক্রম শুরু করতে বাধা দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ ছিল। পরে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় রাস্তা নির্মিত হলে ২০১৬ সালের ৩ জুন অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিজস্ব ক্যাম্পাসে স্থানান্তর করা হয়।
উন্নয়নের নতুন দিগন্ত ৫০০ শয্যার হাসপাতাল প্রকল্প
যশোর গণপূর্ত বিভাগ ও যমেক সূত্রে জানা যায়, হাসপাতাল নির্মাণের জন্য প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৬৭ কোটি টাকা। এরমধ্যে শুধুমাত্র হাসপাতাল ভবন নির্মাণেই ব্যয় হচ্ছে ২৫২ কোটি টাকা; যা এই অঞ্চলের স্বাস্থ্য অবকাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করবে বলে সংশ্লিষ্টদের আশা। ভবন নির্মাণের পাইলিংয়ের কাজ বর্তমানে শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৮ সালের জুনের মধ্যেই এই বৃহৎ প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘হাসান অ্যান্ড সন্স’ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন।
যশোর মেডিকেল কলেজের প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, হাসপাতাল ভবনের স্থাপত্যশৈলী ও কারিগরি সক্ষমতা হবে অত্যাধুনিক। ভবনে ৭৯ হাজার ৯০০ বর্গফুট আয়তনের বিশাল বেজমেন্ট থাকবে; যেখানে ১০৪টি গাড়ি পার্ক করা যাবে। এছাড়া উন্নত আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার রিজার্ভার এবং বিশাল আকারের স্টোর থাকছে বেজমেন্টে। হাসপাতালের নিচতলায় ৮৭ হাজার ৬৬২ বর্গফুট এলাকায় থাকছে অত্যাধুনিক জরুরি বিভাগ, রেডিওলজি ও ইমেজিং ইউনিট, রেজিস্ট্রেশন বুথ এবং উন্নত ক্যাফেটেরিয়া। দ্বিতীয় তলার ৮৩ হাজার ৬৩০ বর্গফুট এলাকায় স্থাপন করা হবে বিশেষায়িত কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট, সিটি স্ক্যান, এমআরআই এবং আল্ট্রাসাউন্ড কক্ষ, যা এই অঞ্চলের রোগীদের ঢাকা বা বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেবে। তৃতীয় তলায় থাকবে প্রশাসনিক ব্লক, ডক্টরস রুম, বিশাল ফার্মেসি এবং স্টোর। চতুর্থ তলায় স্থাপন করা হচ্ছে অতি-সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য ২৫ শয্যার আইসিইউ এবং ২৭ শয্যার সিসিইউ, সাথে থাকছে ১১টি অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার এবং হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট বা এইচডিইউ। পঞ্চম তলা থেকে নবম তলা পর্যন্ত প্রতিটি ফ্লোরে থাকবে জেনারেল ওয়ার্ড, প্রফেসরস রুম এবং মিনি ল্যাব, যেখানে মোট ৪১৭টি সাধারণ শয্যার ব্যবস্থা থাকবে। ভবনটির দশম তলায় থাকছে ৪০টি ভিআইপি কেবিন সুবিধা, যা বিত্তবান রোগীদের উন্নত ও নিরিবিলি চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
এছাড়া কম্পাউন্ডে থাকবে শিক্ষার্থী ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের জন্য পৃথক চারটি হোস্টেল, একটি নার্সিং কলেজ ভবন ও নার্সিং হোস্টেল। স্টাফ নার্স ও কর্মচারীদের জন্য আধুনিক ডরমেটরি ও কোয়ার্টার ছাড়াও থাকছে মসজিদ ও নিজস্ব বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই হাসপাতালটি নির্মাণ শেষ হওয়ার পর যন্ত্রপাতি, আসবাবসহ জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে। যে কারণে এটি পূর্ণাঙ্গরূপে চালু হতে সময় লাগবে ছয় বছর।
বর্তমানে জটিল অস্ত্রোপচার বা হার্টের সমস্যার জন্য এই অঞ্চলের মানুষকে যে ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ যাত্রা করতে হয়, তা আর প্রয়োজন হবে না। এমনকি কম খরচে ব্যয়বহুল পরীক্ষা নিরীক্ষা যেমন ডায়ালাইসিস ও এমআরআই-এর মতো সেবা পাওয়া যাবে। পুরো প্রকল্পটি সামাজিক ও পরিবেশগত দিক বিবেচনায় নিয়ে ডিজাইন করা হয়েছে, যেখানে নারীদের বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে গণপূর্ত বিভাগ যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলাম সুবর্ণভূমিকে বলেন, সবে পাইলিং এর কাজ শেষ হচ্ছে। ২৭ এপ্রিল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্যে দিয়ে হাসপাতাল নির্মাণ কাজ পুরোদমে শুরু হবে। পুরো কাজ শেষ হতে বেশ সময় লাগবে।
যশোর মেডিকেল কলেজের অর্জন ও ঐতিহ্য
বর্তমানে যশোর মেডিকেল কলেজটি খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অধিভুক্ত হয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি এমবিবিএস এবং এক বছরের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ কোর্স করানো হচ্ছে। কলেজটি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল স্বীকৃত এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকাভুক্ত। বাংলাদেশের শীর্ষ ৩০টি সরকারি মেডিকেল কলেজের মধ্যে যশোর মেডিকেল কলেজটির অবস্থান ১৮তম। শিক্ষার্থীদের ক্লিনিক্যাল শিক্ষা কার্যক্রম এখনও পরিচালিত হয় যশোর জেনারেল হাসপাতালে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
এবিষয়ে যশোর মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আইরিন আক্তার ও একই বর্ষের ছাত্র একেএম অসীম মাহমুদসহ একাধিক শিক্ষার্থী সুবর্ণভূমিকে বলেন, প্রাকটিক্যাল ও ক্লিনিক্যাল ক্লাসের জন্য চার কিলোমিটার দূরে জেনারেল হাসপাতালে যাতায়াত করতে হতো। এতে একদিকে যেমন ক্লাসের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়, অন্যদিকে লাইব্রেরি বা পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধার অভাবে ব্যাহত হয় হাতে-কলমে শিক্ষা। বর্তমানে প্রতি বছর এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১০০ জন মেধাবী শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পাচ্ছেন।
নতুন সম্ভাবনা
২০২৪ সালে ফ্যাসিবাদী সরকার বিতাড়িত হলে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভবন নির্মাণের ফাইলটি গতি পায়। ২০২৬ সালে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হওয়ার পর এই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়। টেন্ডার কার্যক্রম শেষে এই বছরের ৮ এপ্রিল পাইলিংয়ের কাজ শুরু হয়। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর তাড়াতাড়ি মূল অবকাঠামো দৃশ্যমান হবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
যশোর মেডিকেল কলেজ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যশোরের নাগরিকরা দীর্ঘ আন্দোলন করেছেন। মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটির সদস্যসচিব জিল্লুর রহমান ভিটু বলেন, যশোর, নড়াইল, ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলার অন্তত ২০ লাখ মানুষ চিকিৎসার জন্য যশোর জেনারেল হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। এখানে ৫০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মিত হলে জেনারেল হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে।
একই মতামত দেন যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়েত।
যশোর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. আবু হাসনাত মোহম্মাদ আহসান হাবিব সুবর্ণভূমিকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর দ্রুতই মূল অবকাঠামো দৃশ্যমান হবে। এর পরে আসবাবপত্র ও জনবল নিয়োগ শেষে হাসপাতাল চালু হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা নিজস্ব হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল ও লাইব্রেরি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে। একই সাথে দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও গবেষকদের পদচারণায় মুখরিত হবে কলেজ ক্যাম্পাস। এখানে শুধু যশোর নয়, পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর রোগীরাও ঘরের কাছে পাবেন উন্নত ও আধুনিক চিকিৎসাসেবা। তাই যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক হাজারেরও বেশি রোগীর ভরসার স্থল হয়ে উঠবে বলে তিনি আশাবাদী।